বাংলাদেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা, আমদানিনির্ভর জ্বালানির চাপ কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌরবিদ্যুৎকে ভবিষ্যতের অন্যতম প্রধান শক্তির উৎস হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, সঠিক নীতি ও সুশাসন নিশ্চিত করা না গেলে সৌরশক্তিও অতীতের ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর মতো নতুন আর্থিক বোঝায় পরিণত হতে পারে।
বাংলাদেশের জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (এনডিসি) অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যমাত্রার বড় অংশই অর্জিত হবে জ্বালানি খাতের মাধ্যমে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে কর-সুবিধা বৃদ্ধি, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ এবং বিদ্যুৎ সঞ্চয় প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের মতো পদক্ষেপ নিয়েছে।
সাম্প্রতিক বাজেটে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ এবং ২০৫০ সালের মধ্যে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে সরবরাহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে শুধু উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য নির্ধারণই যথেষ্ট নয়; বাস্তবায়ন পদ্ধতিই নির্ধারণ করবে এই রূপান্তর কতটা সফল হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, সৌরবিদ্যুৎ নিজে কখনো ব্যয়বহুল নয়; ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে এর সঙ্গে জড়িত বাজারব্যবস্থা, নীতিগত দুর্বলতা এবং অস্বচ্ছ চুক্তির কারণে। আন্তর্জাতিক বাজারে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় দ্রুত কমলেও বাংলাদেশে অনেক প্রকল্পে তুলনামূলকভাবে বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনা হয়েছে। এর পেছনে প্রতিযোগিতাহীন দরপত্র, সরাসরি আলোচনা এবং সীমিত সংখ্যক প্রভাবশালী বিনিয়োগকারীর প্রভাবকে দায়ী করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে কেবল ‘সবুজ’ বা ‘পরিচ্ছন্ন’ শক্তি হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি হতে হবে ‘প্রকৃতি-স্মার্ট’ বা Nature-Smart Energy। অর্থাৎ শুধু কার্বন নিঃসরণ কমালেই হবে না; কৃষিজমি রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ এবং সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহারও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে দেশে প্রায় ১,৮০০ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে, যার বড় অংশই সৌরবিদ্যুৎ। কিন্তু জাতীয় চাহিদার তুলনায় এ সক্ষমতা এখনো সীমিত। ফলে সামনে বড় পরিসরে বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে।
এ ক্ষেত্রে ভূমি ব্যবস্থাপনা অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। বৃহৎ সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে বিস্তীর্ণ জমি প্রয়োজন হয়। ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশে কৃষিজমি অধিগ্রহণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিরোধ সৃষ্টি করতে পারে। তাই বিশেষজ্ঞরা ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, সরকারি ভবন, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, রেলওয়ের অব্যবহৃত জমি, জলাশয়ভিত্তিক ভাসমান সৌর প্রকল্প এবং অনুৎপাদনশীল জমিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন।
রুফটপ সৌরবিদ্যুৎকে সবচেয়ে কার্যকর ও কম বিতর্কিত সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে। এতে নতুন জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হয় না এবং গ্রিডের ওপর চাপও কমে। স্কুল, হাসপাতাল, বাজার, সরকারি কার্যালয় ও আবাসিক ভবনে এ প্রযুক্তির ব্যবহার বিদ্যুৎ উৎপাদনকে আরও বিকেন্দ্রীভূত করতে পারে।
তবে সৌরবিদ্যুতের সুবিধা শুধু বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা ধনী গ্রাহকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। ক্ষুদ্র ব্যবসা, গ্রামীণ প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র এবং সাধারণ পরিবারগুলোকেও সহজ ঋণ, স্বল্প খরচের প্রযুক্তি ও নির্ভরযোগ্য সেবা ব্যবস্থার মাধ্যমে এ খাতে যুক্ত করতে হবে।
সৌরবিদ্যুতের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সঞ্চয় প্রযুক্তি বা ব্যাটারি অবকাঠামোতেও গুরুত্ব দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ সূর্যের আলো সবসময় সমান থাকে না। ব্যাটারি, স্মার্ট গ্রিড, উন্নত পূর্বাভাস ব্যবস্থা এবং সময়ভিত্তিক বিদ্যুৎ মূল্য নির্ধারণ ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তার দীর্ঘমেয়াদে বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
একই সঙ্গে বৈদ্যুতিক যানবাহন ব্যবস্থার সঙ্গে সৌরশক্তির সমন্বয় ঘটানোর সুযোগও রয়েছে। বিদ্যমান জ্বালানি স্টেশনগুলোকে চার্জিং ও ব্যাটারি বদল কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুললে পরিবহন খাতে জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।
অর্থায়নের ক্ষেত্রেও রয়েছে বড় চ্যালেঞ্জ। জলবায়ু অর্থায়নের নামে বাংলাদেশে যে অর্থ আসছে, তার অধিকাংশই ঋণ হিসেবে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য তুলনামূলকভাবে কম দায়ী একটি দেশকে নিজেদের সুরক্ষায় আবার ঋণের বোঝা বহন করতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা তাই অনুদানভিত্তিক অর্থায়ন, স্বল্পসুদে ঋণ এবং ঋণ-প্রকৃতি বিনিময় কর্মসূচির মতো বিকল্প ব্যবস্থার ওপর গুরুত্বারোপ করছেন।
এ ছাড়া কার্বন বাণিজ্য, গ্রিন বন্ড এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল ব্যবহারের সুযোগও রয়েছে। তবে এসব খাতেও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সীমিত কিছু গোষ্ঠী পুরো সুবিধা ভোগ করতে না পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সফল রূপান্তরের জন্য সরকারের একটি সুস্পষ্ট বাস্তবায়ন রোডম্যাপ প্রয়োজন। এতে বছরে বছরে সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুশক্তি, বিদ্যুৎ সঞ্চয় প্রযুক্তি, সৌরচালিত সেচব্যবস্থা এবং শিল্পখাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারের লক্ষ্য নির্ধারণ থাকতে হবে।
তাদের মতে, বাংলাদেশের সামনে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের সময়। দেশ চাইলে সৌরশক্তিকে কেন্দ্র করে একটি বিকেন্দ্রীভূত, স্বচ্ছ ও জনমুখী জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে। আবার একই প্রযুক্তি অস্বচ্ছ চুক্তি, উচ্চ ব্যয় ও সীমিত গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে নতুন সমস্যারও জন্ম দিতে পারে।
তাই সৌরবিদ্যুতের সম্প্রসারণ হতে হবে দ্রুত, কিন্তু সুশাসন ও জবাবদিহিতার ভিত্তিতে। প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র, জনসম্পৃক্ততা, প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি এবং টেকসই অর্থায়ন নিশ্চিত করা গেলে সৌরশক্তি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জলবায়ু সহনশীলতার অন্যতম ভিত্তিতে পরিণত হতে পারে।
