আমস্টারডাম: চীনের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিনির্ভরতা এবং অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে ইউরোপের সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ শিল্প অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন-সমর্থিত একটি নতুন গবেষণা প্রতিবেদন।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে ইউরোপের চিপ খাত বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় আরও পিছিয়ে পড়তে পারে। গবেষণাটি যৌথভাবে পরিচালনা করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইনস্টিটিউট ফর সিকিউরিটি স্টাডিজ এবং ফরাসি গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট মন্টেইন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পদার্থের ওপর চীনের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ এবং তাইওয়ান প্রণালিকে ঘিরে সম্ভাব্য সামরিক উত্তেজনা ইউরোপের সরবরাহ শৃঙ্খলের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। একই সঙ্গে আধুনিক চিপ প্রযুক্তি ও উৎপাদন সরঞ্জামের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতাও ইউরোপের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
গবেষণার সহলেখক এবং ইনস্টিটিউট ফর সিকিউরিটি স্টাডিজের নীতিবিশ্লেষক জোরিস টিয়ার বলেন, অতীতে বেইজিংকে প্রধান ঝুঁকি হিসেবে দেখা হলেও বর্তমানে ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরশীলতাও ইউরোপের কৌশলগত উদ্বেগের বড় উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশেষ করে দ্বিতীয় ট্রাম্প প্রশাসনের সময়কার নীতিগত অবস্থানের কারণে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে এমন একটি আইন প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে, যা অনুমোদিত হলে ওয়াশিংটন মিত্র দেশগুলোর প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারবে। এর ফলে ইউরোপের শীর্ষ চিপ উৎপাদন সরঞ্জাম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এএসএমএলসহ বিভিন্ন কোম্পানির কার্যক্রম প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইউরোপীয় কমিশন ইতোমধ্যে নিজস্ব সেমিকন্ডাক্টর শিল্পকে শক্তিশালী করতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। জুন মাসে তারা ‘চিপস অ্যাক্ট ২.০’ নামে নতুন পরিকল্পনা প্রস্তাব করেছে, যার লক্ষ্য ইউরোপে উৎপাদিত চিপের চাহিদা ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা। পাশাপাশি সরবরাহ শৃঙ্খল সুরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ‘প্যাক্স সিলিকা’ উদ্যোগেও অংশ নিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
শিল্প সংশ্লিষ্ট সংগঠন সেমি ইউরোপের প্রধান লেইথ আলতিমিমে বলেন, গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত না হলে ইউরোপের চিপ শিল্প দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতা, উদ্ভাবন ও প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়বে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপের জন্য সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হতে পারে নিজস্ব শক্তির ক্ষেত্রগুলোকে আরও সম্প্রসারণ করা। বিশেষ করে চিপ উৎপাদন যন্ত্রপাতি ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিতে ইউরোপের যে সক্ষমতা রয়েছে, তা কাজে লাগিয়ে বৈশ্বিক বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, উচ্চ জ্বালানি ব্যয়, পর্যাপ্ত বেসরকারি বিনিয়োগের অভাব এবং চিপনির্ভর শিল্পখাতের ধীরগতির কারণে ইউরোপের সেমিকন্ডাক্টর খাত প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা হারাচ্ছে। এসব কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা না করা গেলে ভবিষ্যতে বৈশ্বিক চিপ বাজারে ইউরোপের অবস্থান আরও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৌশলগত প্রযুক্তি খাতে স্বনির্ভরতা বৃদ্ধি এবং নিরাপদ সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলাই ইউরোপের চিপ শিল্পকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করার প্রধান শর্ত।
