ঢাকা: বাংলাদেশের অধিকাংশ কৃষক এখনো সুষম মাত্রায় সার ব্যবহার করছেন না, যার ফলে মাটির স্বাস্থ্য, কৃষি উৎপাদনশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ কৃষক নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম ও সালফারের সঠিক সমন্বয় বজায় রেখে সার প্রয়োগ করেন না।
বিশ্বব্যাংকের ‘রিপারপোজিং অ্যাগ্রিকালচারাল পাবলিক স্পেন্ডিং ফর কোয়ালিটি গ্রোথ অ্যান্ড জবস ইন বাংলাদেশস অ্যাগ্রিফুড সিস্টেম’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মাত্র ৫ শতাংশ কৃষক বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারিত সুষম পুষ্টি ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করেন।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কৃষক প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ফসফরাস ব্যবহার করেন। অন্যদিকে প্রায় ৯০ শতাংশ কৃষক পর্যাপ্ত সালফার প্রয়োগ করেন না এবং ৬০ শতাংশ কৃষকের জমিতে পটাশিয়ামের ঘাটতি দেখা যায়। নাইট্রোজেন ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অসামঞ্জস্য রয়েছে। ধান চাষে অনেক কৃষক প্রয়োজনের তুলনায় কম নাইট্রোজেন ব্যবহার করলেও পেঁয়াজ ও সবজি চাষে অতিরিক্ত প্রয়োগের প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।
অঞ্চলভেদে সারের ব্যবহারেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। বরিশাল ও সিলেট অঞ্চলে প্রয়োজনের তুলনায় কম সার প্রয়োগের প্রবণতা বেশি, বিপরীতে খুলনা ও রাজশাহীতে অতিরিক্ত সার ব্যবহারের হার তুলনামূলক বেশি।
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সারের সুষম ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে বোরো ধানের উৎপাদন প্রায় ৩৩ শতাংশ, আমন ধানের উৎপাদন ৬৫ শতাংশ এবং আলুর উৎপাদন ৮৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষকদের মধ্যে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সার ব্যবহারের জ্ঞান ও সচেতনতার অভাবই এ সমস্যার অন্যতম প্রধান কারণ। যদিও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বার্ক) বিভিন্ন ফসলের জন্য সারের ব্যবহারবিষয়ক সুপারিশ তৈরি করেছে, তবে সেসব নির্দেশনা মাঠপর্যায়ে কার্যকরভাবে পৌঁছাচ্ছে না।
বিশ্বব্যাংকের গবেষণা বিশ্লেষক জনায়েদ সহল বলেন, কৃষকরা এখনও অনেক ক্ষেত্রে প্রচলিত অভ্যাসের ওপর নির্ভর করছেন। ফলে বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারিত পুষ্টি ব্যবস্থাপনার সুফল তারা পাচ্ছেন না। তিনি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কার্যক্রম আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, অনিয়ন্ত্রিত ও অসম সার ব্যবহারের কারণে দেশের মাটির গুণগত মান ক্রমেই অবনতি হচ্ছে। অতিরিক্ত রাসায়নিক সারের ব্যবহারে মাটির অম্লতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং পানি ধারণক্ষমতা কমে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতের কৃষি উৎপাদনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানিয়েছেন, বাংলাদেশের মাটির গড় পিএইচ মান বর্তমানে প্রায় ৪ দশমিক ৫, যেখানে মাটির মান উন্নয়নের জন্য ৬ দশমিক ৫-এর বেশি পিএইচ প্রয়োজন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত রাসায়নিক উপাদান ব্যবহারের কারণে মাটির উর্বরতা হ্রাস পেয়েছে। এ পরিস্থিতি মূল্যায়নে সরকার দেশব্যাপী মাটির নমুনা পরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আবদুর রহিম সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেন, একই জমিতে বারবার ফসল উৎপাদনের ফলে মাটির জৈব পদার্থের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। যেখানে আদর্শভাবে মাটিতে প্রায় ৫ শতাংশ জৈব পদার্থ থাকা উচিত, সেখানে দেশের অধিকাংশ জমিতে তা মাত্র শূন্য দশমিক ৫ থেকে ১ দশমিক ৭ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
তার মতে, টেকসই কৃষি নিশ্চিত করতে হলে মাটিতে অন্তত ২ শতাংশ জৈব পদার্থের উপস্থিতি প্রয়োজন। অন্যথায় প্রত্যাশিত উৎপাদন পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
বিশ্বব্যাংক আরও জানিয়েছে, বিদ্যমান জমি, শ্রম ও কৃষি উপকরণ আরও দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করা গেলে দেশের কৃষি উৎপাদন প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা কৃষকদের সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য টেলিভিশন, রেডিও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অঞ্চলভিত্তিক তথ্যসমৃদ্ধ প্রচারণা কার্যক্রম জোরদারের পরামর্শ দিয়েছেন। পাশাপাশি জমিভিত্তিক মাটির পুষ্টি মানচিত্র তৈরি করে নির্দিষ্ট এলাকার জন্য পৃথক সুপারিশ প্রণয়নের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কৃষিমন্ত্রীর মতে, মাঠপর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যেও মাটির স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। তিনি বলেন, সরকার প্রস্তাবিত নতুন কৃষিনীতি বাস্তবায়ন করতে পারলে ২৩ শতাংশের বেশি কৃষি উপকরণ সাশ্রয় করা সম্ভব হবে, একই সঙ্গে উৎপাদন বাড়বে এবং কৃষকের ব্যয়ও কমে আসবে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, সুষম সার ব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে তোলা এবং মাটির স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে দেশের কৃষি উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
