উচ্চ কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত স্ট্যাটিন বিশ্বের অন্যতম বহুল ব্যবহৃত ওষুধ। তবে অনেক রোগীর মধ্যে একটি সাধারণ প্রশ্ন হলো—স্ট্যাটিন গ্রহণ করলে কি ওজন বেড়ে যায়? বর্তমান বৈজ্ঞানিক তথ্য বলছে, স্ট্যাটিনের সরাসরি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে ওজন বৃদ্ধি প্রমাণিত নয়। তবুও কিছু মানুষ ওষুধ গ্রহণের সময় ওজন বাড়তে দেখেন, যার পেছনে জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্ট্যাটিন ব্যবহারের পর অনেকেই মনে করতে পারেন যে কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে, তাই খাদ্য নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন কম। ফলে তারা বেশি চর্বি, ক্যালোরি বা প্রক্রিয়াজাত খাবার খেতে শুরু করতে পারেন, যা ধীরে ধীরে ওজন বৃদ্ধির কারণ হতে পারে।
কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, স্ট্যাটিন ব্যবহারকারীদের মধ্যে কোমরের পরিধি বৃদ্ধি, পেটের চর্বি জমা এবং সামগ্রিক ওজন বৃদ্ধির মতো পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। তবে এসব পরিবর্তন সরাসরি ওষুধের কারণে নাকি জীবনযাপনের অন্যান্য কারণে হচ্ছে, তা এখনও নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
সাম্প্রতিক একটি প্রাণীভিত্তিক গবেষণায় অ্যাটোরভাস্টাটিন নামের একটি জনপ্রিয় স্ট্যাটিনের প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, ওষুধটি কিছু বিপাকীয় পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। গবেষকদের পর্যবেক্ষণে ক্ষুধা উদ্দীপক হরমোন ঘ্রেলিনের মাত্রা বেড়েছে, ইনসুলিন প্রতিরোধের প্রবণতা দেখা গেছে এবং চর্বি কোষ থেকে উৎপন্ন কিছু হরমোনের মাত্রায় পরিবর্তন ঘটেছে।
ঘ্রেলিন ক্ষুধা বাড়াতে ভূমিকা রাখে, ফলে অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে ইনসুলিন প্রতিরোধের কারণে শরীরের জন্য ওজন নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যেতে পারে। এছাড়া লেপটিন ও রেজিস্টিনের মতো হরমোনের পরিবর্তনের সঙ্গে স্থূলতার সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে বিজ্ঞানীরা আরও গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
তবে গবেষকরা সতর্ক করে বলছেন, প্রাণীর ওপর পরিচালিত গবেষণার ফলাফল সবসময় মানুষের ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য হয় না। তাই স্ট্যাটিন ও ওজন বৃদ্ধির মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক আছে কি না, তা নিশ্চিত করতে আরও মানবভিত্তিক গবেষণা প্রয়োজন।
চিকিৎসকদের মতে, স্ট্যাটিন গ্রহণের সময় ওজন নিয়ন্ত্রণের কৌশল সাধারণ মানুষের জন্য প্রযোজ্য নিয়মের মতোই। নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম, সুষম খাদ্যাভ্যাস এবং পর্যাপ্ত ঘুম ওজন নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিশেষজ্ঞরা সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক ব্যায়াম করার পরামর্শ দেন। পাশাপাশি খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত আঁশযুক্ত খাবার রাখা, অতিরিক্ত চিনি এড়িয়ে চলা, পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং কম পুষ্টিগুণসম্পন্ন খাবারের পরিবর্তে স্বাস্থ্যকর বিকল্প বেছে নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য কোনো নির্দিষ্ট স্ট্যাটিনকে অন্যগুলোর তুলনায় বেশি কার্যকর বলা যায় না। কারণ এসব ওষুধ মূলত কোলেস্টেরল কমানোর জন্য তৈরি হয়েছে, ওজন কমানো বা বাড়ানোর জন্য নয়। রোগীর স্বাস্থ্যগত অবস্থা, কোলেস্টেরলের মাত্রা এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকি বিবেচনা করেই চিকিৎসক উপযুক্ত স্ট্যাটিন নির্বাচন করেন।
সার্বিকভাবে বর্তমান তথ্য বলছে, স্ট্যাটিন সরাসরি ওজন বাড়ায়—এমন শক্ত প্রমাণ নেই। তবে ওষুধ গ্রহণের সময় খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনে পরিবর্তন এলে ওজন বাড়তে পারে। তাই স্ট্যাটিন গ্রহণের পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলাই কোলেস্টেরল ও ওজন—দুই ক্ষেত্রেই ইতিবাচক ফল পেতে সহায়তা করতে পারে।
