স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ছিটমহল সিউটায় আশ্রয়ের দাবিতে শত শত অভিবাসী বিক্ষোভ করেছেন। মরক্কোতে ফেরত না পাঠিয়ে স্পেনে আশ্রয় দেওয়ার দাবি জানিয়ে রোববার তাঁরা শহরের এল ত্রাম্পোলিন সৈকতে জড়ো হন। এর আগে গত ৩০ ও ৩১ জুলাই মরক্কো সীমান্ত দিয়ে রেকর্ডসংখ্যক অভিবাসী সিউটায় প্রবেশ করেন।
প্রায় দুই সপ্তাহ আগে মরক্কো সীমান্ত পেরিয়ে ৭২ হাজার মানুষ সিউটায় প্রবেশ করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এটিকে সবচেয়ে বড় সীমান্ত অনুপ্রবেশের ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিপুলসংখ্যক মানুষের আগমনে ছিটমহলটির বিদ্যমান সক্ষমতার ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে।
সিউটায় থাকা বেশির ভাগ অভিবাসী মূল ভূখণ্ডে যাওয়ার সুযোগের অপেক্ষায় শহরের উপকণ্ঠ কিংবা এল ত্রাম্পোলিন সৈকতে মানবেতর পরিবেশে দিন কাটাচ্ছেন। মরক্কোর তেতুয়ান থেকে আসা আইয়ুব এলআরুদ বলেন, ‘আমরা সমুদ্রের পাশে ঘুমাচ্ছি। এখানে মারাত্মক ঠান্ডা আর দুর্গন্ধ। আমরা অনেক কষ্টে আছি। পুলিশও শহরের দিকে যেতে বাধা দিচ্ছে।’
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের হাতে স্পেনের পতাকা ও বিভিন্ন ব্যানার দেখা যায়। ব্যানারগুলোতে লেখা ছিল, ‘আমরা মরক্কোয় ফিরে যেতে চাই না’ এবং ‘আমরাও মানুষ’। এ সময় তাঁরা ‘আমরা ক্লান্ত’ ও ‘আমাদের একটি সমাধান দরকার’ স্লোগান দেন।
বিক্ষোভস্থলের আশপাশে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের কঠিন জীবনযাপনের চিত্রও দেখা যায়। কেউ পাথুরে তীরে কাপড় ধুচ্ছিলেন, আবার কেউ বাঁশের তৈরি ছিপ দিয়ে মাছ ধরছিলেন।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে স্পেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফার্নান্দো গ্রান্দে-মারলাস্কা জানান, অনিয়মিতভাবে সিউটায় প্রবেশ করা অভিবাসীদের সেখানে অবস্থান, স্পেনের মূল ভূখণ্ডে যাওয়া কিংবা বৈধ মর্যাদা পাওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে না। তবে চরম ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম রাখা হতে পারে বলে জানান তিনি।
এদিকে সিউটার মেডিক্যাল বোর্ডের প্রধান এনরিকে রোভিরাল্তা ওন্দা সেরো রেডিওকে বলেন, সীমিতসংখ্যক স্বাস্থ্যকর্মীর ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ায় তাঁরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিক্রিয়াও যথেষ্ট দ্রুত নয় বলে তিনি সমালোচনা করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ডায়রিয়া ও খোসপাঁচড়ার মতো সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ছে এবং সহিংসতার ঘটনাও বাড়ছে।
তবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মনিকা গার্সিয়া বলেন, স্বাস্থ্যসেবার ওপর চাপ তৈরি হলেও ব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি। অভিবাসনের সঙ্গে রোগব্যাধিকে সরাসরি যুক্ত করা অন্যায্য এবং জেনোফোবিক বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, অভিবাসীদের মধ্যে মহামারি ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি মাঝারি; স্থানীয় বাসিন্দাদের ক্ষেত্রে এ ঝুঁকি কম।
সিউটায় অবস্থানরত অধিকাংশ অভিবাসনপ্রত্যাশী মরক্কোর নাগরিক। তাঁরা রয়টার্সকে জানান, নিজ দেশে কর্মসংস্থানের পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় তাঁরা ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। তাঁদের অনেকেরই উচ্চতর শিক্ষাগত ও পেশাগত যোগ্যতা রয়েছে।
সংঘাতকবলিত উত্তর-পূর্ব নাইজেরিয়া থেকে আসা ৩০ বছর বয়সী ইমানুয়েল পেশায় ইলেকট্রিশিয়ান। সন্তানদের অপহরণের আশঙ্কায় তাদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তিনি উন্নত জীবনের আশায় ইউরোপে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। নাইজার, আলজেরিয়া ও মরক্কো হয়ে চার মাসের ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা শেষে তিনি সিউটায় পৌঁছান। ইমানুয়েল বলেন, ‘আমি তাদের জন্য আরও ভালো জীবনের লড়াই করছি।’ যে কাজই দেওয়া হোক, তিনি তা করতে প্রস্তুত বলেও জানান।
দক্ষিণ সেনেগাল থেকে আসা উসমান জানান, যৌন পরিচয়ের কারণে নিজ দেশে নির্যাতনের শিকার হওয়ায় তিনি রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেছেন। স্থানীয় কয়েকটি বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করেও এখনো কোনো উত্তর পাননি তিনি। উসমান বলেন, ‘সবচেয়ে খারাপ বিষয় হলো সারাদিন কিছুই না করে বসে বসে ইমেইল চেক করা এবং উত্তরের অপেক্ষা করা।’
সিউটায় বিপুলসংখ্যক অভিবাসীর অবস্থানকে কেন্দ্র করে মানবিক পরিস্থিতির পাশাপাশি নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যেই আশ্রয়ের দাবিতে অভিবাসীদের বিক্ষোভ পরিস্থিতির ওপর নতুন করে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
