শেরপুরের গারো পাহাড়ে প্রায় দুই দশক আগে গড়ে তোলা জেলার প্রথম বাণিজ্যিক আগরবাগান এখন সুগন্ধি উৎপাদনের উপযোগী হয়ে উঠেছে। ময়মনসিংহ বন বিভাগ জানিয়েছে, ১০০ একরের এই বাগানটি দরপত্রের মাধ্যমে বিক্রি করা হবে। বিক্রয়মূল্যের ৪৫ শতাংশ পাবেন দীর্ঘদিন ধরে বাগান পরিচর্যায় যুক্ত ৮০ জন স্থানীয় অংশীজন।
গাছের কাণ্ডে পোকা বা ছত্রাকের আক্রমণ সাধারণত ক্ষতির কারণ হলেও আগরগাছের ক্ষেত্রে সেই ক্ষত থেকেই তৈরি হয় মূল্যবান সুগন্ধিযুক্ত রজন। দীর্ঘ ১৯ বছরের পরিচর্যার পর শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার ছোটগজনীর আগরবাগান এখন আগর তেল বা আতর উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত।
ময়মনসিংহ বন বিভাগের উদ্যোগে ২০০৭-০৮ অর্থবছরে ঝিনাইগাতী উপজেলার রাংটিয়া রেঞ্জের গজনী বিটের ছোটগজনীতে ১০০ একর বনভূমিতে প্রায় ৮০ হাজার আগরের চারা রোপণ করা হয়। পরে ২০১০-১১ অর্থবছরে শ্রীবরদী উপজেলার বালিঝুড়ি রেঞ্জের মালাকুচা বিটের ঝুলগাঁও এলাকায় আরও ৪০ একর বনভূমিতে ২৫ থেকে ৩০ হাজার চারা লাগানো হয়।
বন বিভাগ জানিয়েছে, ছোটগজনীর বাগানটি এখন পূর্ণ পরিপক্ব হওয়ায় আটটি প্লটে বিভক্ত বাগানটি উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে বিক্রি করা হবে। নির্বাচিত প্রতিষ্ঠান তিন কিস্তিতে মূল্য পরিশোধের সুযোগ পাবে এবং গাছ কেটে প্রক্রিয়াজাত করার জন্য দুই বছর সময় দেওয়া হবে। বিক্রয়লব্ধ অর্থের ৪৫ শতাংশ বাগানের পরিচর্যায় নিয়োজিত ৮০ জন স্থানীয় অংশীজনের মধ্যে বিতরণ করা হবে।
বর্তমান রাংটিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা আবদুল করিম, যিনি বাগানটি প্রতিষ্ঠার সময় দায়িত্বে ছিলেন, বলেন, এটি শেরপুর জেলার প্রথম আগরবাগান। বিভিন্ন এলাকা থেকে বীজ সংগ্রহ করে চারা উৎপাদনের মাধ্যমে বাগানটি গড়ে তোলা হয়েছিল। বর্তমানে এটি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের উপযোগী হওয়ায় দরপত্রের মাধ্যমে বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, প্রাকৃতিকভাবে বিটল পোকা ও ছত্রাকের আক্রমণের ফলে আগরগাছ আত্মরক্ষার জন্য বিশেষ ধরনের রজন উৎপাদন করে। সময়ের সঙ্গে সেই রজন কাঠের ভেতরে জমে কালচে ও সুগন্ধিযুক্ত অংশে পরিণত হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে সাধারণত ১৫ থেকে ২০ বছর সময় লাগে।
বাণিজ্যিকভাবে আগর তেল উৎপাদনের ক্ষেত্রে এবার প্রচলিত পদ্ধতিতে গাছে পেরেক ঢোকানো হবে না। পরিবর্তে বিশেষ একটি পদার্থ প্রয়োগ করে নিয়ন্ত্রিতভাবে ছত্রাকের সংক্রমণ ঘটানো হবে। এরপর রজনসমৃদ্ধ কাঠ সংগ্রহ করে পাতন প্রক্রিয়ায় আগর তেল বা আতর তৈরি করা হবে। যেসব গাছে পর্যাপ্ত রজন তৈরি হয় না, সেগুলোর কাঠ থেকেও সুগন্ধি উৎপাদন সম্ভব হলেও তার মান তুলনামূলক কম হয়ে থাকে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, শুরুতে বিভিন্ন এলাকা থেকে আগরের বীজ সংগ্রহ করে ৬০ থেকে ৭০ হাজার চারা উৎপাদন করা হয়। পাশাপাশি সিলেট থেকে আরও প্রায় ১০ হাজার চারা এনে রোপণ করা হয়। এরপর স্থানীয় ৮০ জন বাসিন্দাকে নিয়ে আটটি অংশীজন দল গঠন করে বাগানের পরিচর্যার দায়িত্ব দেওয়া হয়। গত ১৯ বছর ধরে নিয়মিত পরিচর্যা ও পাহারার মাধ্যমে তাঁরা বাগানটি রক্ষা করেছেন।
ছোটগজনী গ্রামের অংশীজন ফিলিসন কুবি বলেন, “প্রতিবছর আগাছা পরিষ্কার করেছি, রাতে পাহারা দিয়েছি। এখন গাছ পরিপক্ব হয়েছে। বাগান বিক্রি হলে আমাদের দীর্ঘদিনের পরিশ্রম সার্থক হবে।”
দুধনই গ্রামের অংশীজন হারুন অর রশিদ বলেন, “গারো পাহাড়ে আগে আগরের বাগান ছিল না। বন বিভাগের উদ্যোগে এই বাগান হয়েছে। ১৯ বছর ধরে পরিচর্যা করেছি। এখন বাগান বিক্রি হলে বন বিভাগের পাশাপাশি আমরাও লাভবান হব।”
বন বিভাগ জানায়, আগরগাছের কাঠ ছোট ছোট টুকরো করে ১০ থেকে ৩০ দিন পানিতে ভিজিয়ে রাখার পর বিশেষ চুল্লিতে পাতন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আগর তেল সংগ্রহ করা হয়। এই তেল থেকে তৈরি আতরের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইনসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চ চাহিদা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ থেকে এখনো তুলনামূলক কম পরিমাণ আগরজাত পণ্য রপ্তানি হয়।
ময়মনসিংহ বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক এস বি তানভীর আহমদ ইমন বলেন, “আগরগাছ থেকে মানসম্মত সুগন্ধি পেতে সাধারণত প্রায় ২০ বছর সময় লাগে। ছোটগজনীর ১০০ একরের বাগানটি এখন পরিপক্ব। তাই দরপত্রের মাধ্যমে এটি বিক্রি করা হবে। আগরের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এই উদ্যোগে বন বিভাগের পাশাপাশি স্থানীয় অংশীজনেরাও অর্থনৈতিকভাবে উপকৃত হবেন।”
