মশা মারতে চীনের লেজার ‘এয়ার ডিফেন্স’! উড়ন্ত মশার পাখায় পালস ফায়ার করে নামাবে এই প্রযুক্তি

মশা মারতে চীনের লেজার ‘এয়ার ডিফেন্স’! উড়ন্ত মশার পাখায় পালস ফায়ার করে নামাবে এই প্রযুক্তি

 

 

কীভাবে কাজ করে এই লেজার মশা প্রতিরোধ ব্যবস্থা?

ডিভাইসটির কাজের পদ্ধতি অনেকটা ছোট আকারের একটি এয়ার-ডিফেন্স সিস্টেমের মতো। প্রথমে সেন্সর ব্যবহার করে আশপাশের বাতাসে উড়তে থাকা ছোট পোকামাকড় শনাক্ত করা হয়। এরপর সিস্টেমটি লক্ষ্যবস্তুর গতিবিধি বিশ্লেষণ করে তার অবস্থান নির্ধারণ করে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ব্যবস্থায় একাধিক প্রযুক্তি একসঙ্গে কাজ করে। এর মধ্যে রয়েছে LiDAR, মিলিমিটার-ওয়েভ রাডার এবং AI-ভিত্তিক ভিশন সিস্টেম

LiDAR ব্যবহার করা হয় লক্ষ্যবস্তুর দূরত্ব ও অবস্থান নির্ধারণে। মিলিমিটার-ওয়েভ রাডার মশার মতো ক্ষুদ্র উড়ন্ত বস্তুর গতিবিধি শনাক্ত করতে সাহায্য করে। আর AI ভিশন মডিউল লক্ষ্যটি সত্যিই মশা বা অন্য কোনো ক্ষুদ্র পোকা কি না, তা শনাক্ত করতে ব্যবহৃত হয়।

 

পাখায় লেজার পালস, তারপর মশার পতন

লক্ষ্য শনাক্ত হওয়ার পর ডিভাইসটির গ্যালভানোমিটার-নিয়ন্ত্রিত লেজার দ্রুত নির্দিষ্ট স্থানে তাক করে। এরপর একটি ছোট লেজার পালস ছোড়া হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, মশার শরীরের পরিবর্তে তার পাখাকে লক্ষ্য করা হয়। পাখা ক্ষতিগ্রস্ত হলে মশাটি আর স্বাভাবিকভাবে উড়তে পারে না এবং নিচে পড়ে যায়।

ডিভাইসটি অনুভূমিকভাবে প্রায় ৯০ ডিগ্রি এলাকায় স্ক্যান করতে পারে বলে নির্মাতার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। লক্ষ্য শনাক্ত হওয়ার পর সেটির অবস্থান ও গতিপথ নির্ধারণ করে লেজার পালস ছোড়া হয়।

 

ইনফ্রারেড ও ব্লু-লেজার—দুই সংস্করণ

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই লেজারভিত্তিক মশা প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুটি সংস্করণে তৈরি করা হয়েছে—ইনফ্রারেড এবং ব্লু-লেজার

এর লক্ষ্য হলো প্রচলিত রাসায়নিক স্প্রে বা কীটনাশকের পরিবর্তে একটি স্বয়ংক্রিয় ও রাসায়নিকমুক্ত পদ্ধতিতে মশা নিয়ন্ত্রণ করা।

বিশেষ করে ঘরের ভেতর, নির্দিষ্ট কর্মক্ষেত্র বা এমন জায়গায় যেখানে রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার সীমিত রাখতে হয়, এ ধরনের প্রযুক্তি ভবিষ্যতে ব্যবহার করা যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

 

ড্রোন প্রতিরক্ষার সঙ্গে মিল কোথায়?

এই প্রযুক্তির সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো এর কাজের ধাপ। আধুনিক ড্রোন-বিরোধী লেজার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় সাধারণত লক্ষ্য শনাক্ত করা, সেটিকে ট্র্যাক করা, সঠিকভাবে নিশানা করা এবং শেষে শক্তি প্রয়োগ করে লক্ষ্যবস্তুকে নিষ্ক্রিয় করা হয়।

মশা মারার এই ডিভাইসেও একই ধরনের মৌলিক প্রক্রিয়া দেখা যাচ্ছে—Detect, Track, Target এবং Disable

তবে সামরিক লেজার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে এই ডিভাইসকে সরাসরি তুলনা করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা দরকার। মশার মতো ক্ষুদ্র ও ধীর লক্ষ্যবস্তুর জন্য তৈরি একটি পোর্টেবল ডিভাইসের ক্ষমতা সামরিক পর্যায়ের উচ্চ-শক্তির লেজার অস্ত্রের সমতুল্য নয়।

 

রাসায়নিক ছাড়াই মশা নিয়ন্ত্রণের সম্ভাবনা

মশা নিয়ন্ত্রণে সাধারণত স্প্রে, কয়েল, ভ্যাপোরাইজার ও অন্যান্য রাসায়নিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। লেজারভিত্তিক প্রযুক্তির অন্যতম সম্ভাব্য সুবিধা হলো—এটি লক্ষ্যবস্তু নির্দিষ্ট করে কাজ করতে পারে।

ফলে তাত্ত্বিকভাবে আশপাশে নির্বিচারে রাসায়নিক ছড়ানোর প্রয়োজন কমতে পারে। একই সঙ্গে স্বয়ংক্রিয় সেন্সর ব্যবস্থার কারণে মানুষের নিয়মিত হস্তক্ষেপও কমানোর সুযোগ রয়েছে।

তবে প্রযুক্তিটির বাস্তব কার্যকারিতা, নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ খরচ, ছোট পোকামাকড় শনাক্ত করার নির্ভুলতা এবং মানুষের চোখের জন্য লেজারের নিরাপত্তা—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

 

বড় পরিসরে উৎপাদন শুরু

Photon Matrix Lab-এর তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট ২০২৬ থেকে ডিভাইসটির বড় পরিসরে উৎপাদন শুরু হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি একটি অফিসিয়াল অনলাইন স্টোরও চালু করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থাৎ এটি শুধু পরীক্ষাগারে থাকা একটি ধারণা নয়; বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবেও বাজারে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মশা নিয়ন্ত্রণে লেজার ব্যবহারের এই প্রযুক্তি কতটা কার্যকর এবং সাধারণ মানুষের জন্য কতটা নিরাপদ ও সাশ্রয়ী হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে ড্রোন প্রতিরক্ষা থেকে মশা নিয়ন্ত্রণ—লেজার প্রযুক্তির এই অপ্রত্যাশিত ব্যবহার নিঃসন্দেহে প্রযুক্তি বিশ্বের একটি অভিনব উদাহরণ।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *