দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েছেন বিএনপি সরকারের নতুন প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। এর আগে তিনি প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর তাঁর বিদেশি নাগরিকত্ব রয়েছে কি না, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিএনপি সরকার গঠনের ছয় মাসের মাথায় মন্ত্রিসভায় রদবদল হয়। এতে চার মন্ত্রী ও দুই প্রতিমন্ত্রী শপথ নেন। নতুন প্রতিমন্ত্রীদের একজন হুমায়ুন কবির।
সম্প্রতি কয়েকটি গণমাধ্যমে তাঁর দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকার বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। বিষয়টি নিয়ে সোমবার ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকেরা তাঁকে প্রশ্ন করেন। তবে বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন কি না—এ বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কোনো উত্তর দেননি। বরং তিনি প্রশ্ন করেন, ‘কে এটা নিয়ে নিউজ করেছে, কার এত জ্বালা?’ তাঁর এই মন্তব্যের পর বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী কাজী জাহেদ ইকবাল বিবিসি বাংলাকে বলেন, বিষয়টি সাংবিধানিক। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি অন্য দেশের নাগরিক হলে তিনি সংসদ সদস্য, মন্ত্রী বা কোনো সাংবিধানিক পদে যেতে পারবেন না।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে সংসদ সদস্য হওয়ার ক্ষেত্রে বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব বা আনুগত্যকে অযোগ্যতার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আর মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা সাধারণত সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে নিয়োগ পাওয়ায় তাঁদের ক্ষেত্রেও এ ধরনের সাংবিধানিক বিধিনিষেধ প্রযোজ্য হয়।
সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী নিয়োগের বিষয়ে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি তাঁদের নিয়োগ দেন। তবে সংসদ সদস্য নন বা টেকনোক্র্যাট কোটায় যাঁদের নিয়োগ দেওয়া হবে, তাঁদেরও সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা থাকতে হবে।
সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিকের ব্যাখ্যাও প্রায় একই। তাঁর মতে, বাংলাদেশের সংবিধানে সংসদ সদস্য হওয়ার যে যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছে, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের ক্ষেত্রেও মূলত একই যোগ্যতা প্রযোজ্য। ফলে কেউ সংসদ সদস্য হওয়ার ক্ষেত্রে অযোগ্য হলে তিনি মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীও হতে পারবেন না।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে বলা হয়েছে, হুমায়ুন কবির শৈশব থেকে যুক্তরাজ্যে বসবাসের কারণে দেশটির নাগরিকত্ব পেয়েছেন। এ কারণে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার আগে বা নেওয়ার সময় তিনি যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অন্যদিকে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আরেক প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হুমায়ুন কবির গত ছয় মাস প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ কারণে প্রশ্ন উঠেছে, দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকলে তিনি কীভাবে উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারলেন, কিন্তু প্রতিমন্ত্রী হতে পারবেন না কেন?
এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, উপদেষ্টা পদটি সাংবিধানিকভাবে মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর সমতুল্য নয়। এটি সরকারের প্রশাসনিক ও পরামর্শমূলক দায়িত্ব। ফলে উপদেষ্টা হওয়ার ক্ষেত্রে মন্ত্রী বা সংসদ সদস্যদের মতো একই সাংবিধানিক শর্ত সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
এ কারণে দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা কোনো ব্যক্তি উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারলেও মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী হওয়ার ক্ষেত্রে সাংবিধানিক জটিলতা তৈরি হতে পারে।
হুমায়ুন কবিরের নাগরিকত্বের বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। তবে বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
