নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পর নতুন করে বন্যার আশঙ্কায় তিব্বতের অংশে উদ্ধার অভিযান স্থগিত করেছে চীন। বুধবারের ভূমিধসের পর সৃষ্ট একটি জলাধারে পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় সেটি উপচে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে নেপালে বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪৭৫ জনে দাঁড়িয়েছে।
নেপাল পুলিশের সর্বশেষ হিসাবে, স্থানীয় সময় শুক্রবার সকাল ৯টা পর্যন্ত রসুয়া জেলায় বন্যায় ৪৭৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। দুর্গত এলাকায় উদ্ধার ও তল্লাশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক থেকে প্রতিবন্ধকতা সরানোর কাজও চলছে।
তিব্বতের দিকে তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে এবং ৫৫০ জনের বেশি নিখোঁজ রয়েছেন। তবে নেপাল ও তিব্বতের নিখোঁজ ও মৃতের হিসাবের মধ্যে কোনো ব্যক্তির তথ্য দুই জায়গায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত নয়।
চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, বুধবারের ভূমিধসের পর তৈরি হওয়া জলাধার থেকে শুক্রবার পানি উপচে পড়েছে। জলাধারটি পানিতে পূর্ণ হয়ে যাওয়ার পর ধীরে ধীরে পানি বের হতে শুরু করেছে।
চীনা কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং উদ্ধার অভিযান সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে। জলাধারটির আশপাশে পরিস্থিতি আরও ভালোভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য নজরদারি ক্যামেরা স্থাপনের কাজও চলছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, জলাধারটি গিরিয়ং বন্দর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে এবং এতে ২০ লাখ ঘনমিটারের বেশি পানি জমেছে।
নেপাল পুলিশও তিব্বতের দিকে একটি পানির বাঁধ ভেঙে যাওয়ার সতর্কতা জারি করেছে। স্থানীয় বাসিন্দা, উদ্ধারকর্মী ও নিরাপত্তা বাহিনীকে সতর্ক থাকার পাশাপাশি নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
উত্তর নেপালে আরও বন্যার সতর্কতার মধ্যে জরুরি কর্মীরা মানুষকে উঁচু এলাকায় সরিয়ে নিচ্ছেন। ত্রিশূলি নদীর ওপরের একটি এলাকায় নিরাপত্তার জন্য মানুষ জড়ো হয়েছে।
ত্রিশূলিতে সেনাবাহিনীর ব্যারাকে কয়েক মিনিট পরপর হেলিকপ্টার অবতরণ করছে। এসব হেলিকপ্টারে আহতসহ উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের নিয়ে আসা হচ্ছে। অন্যদিকে স্বজনদের খোঁজে উদ্ধারকেন্দ্রের বাইরে বহু মানুষ অপেক্ষা করছেন।
উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের নামের তালিকা দেখতে দুর্গতদের স্বজনদের ভিড় করতেও দেখা গেছে।
নেপাল সেনাবাহিনী জানিয়েছে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত রসুয়া ও নুয়াকোট জেলা থেকে এখন পর্যন্ত ৯০০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ১১৯ জন বিদেশি নাগরিক, যাঁদের ৯২ জন ভারতীয়।
সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রাজরাম বাসনেট জানিয়েছেন, উদ্ধার হওয়া ৯০০ জনই আহত এবং তাঁদের হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তবে তাঁদের শারীরিক অবস্থার বিস্তারিত জানাননি তিনি।
বৃষ্টি ও অনিশ্চিত আবহাওয়ার কারণে উদ্ধারকাজ ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে বলে জানান তিনি। এরপরও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে অভিযান জোরদারের চেষ্টা চলছে বলে জানান বাসনেট।
তিনি বলেন, জীবনে এমন দুর্যোগ আগে দেখেননি।
চীনের সরকারি বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, বন্যায় আটকে পড়া ৫৫৫ পর্যটককে তিব্বত থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে তাঁদের জাতীয়তা জানানো হয়নি।
বন্যার পর তিব্বত থেকে তথ্য সীমিতভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, দুর্যোগে তাদের নাগরিকদের কয়েকজন নিখোঁজ রয়েছেন।
চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সীমান্ত এলাকায় সৃষ্ট জলাধারটি ফেটে গেলে আগামী দিনগুলোতে আরও বন্যা হতে পারে। এ আশঙ্কায় তিব্বতে উদ্ধারকর্মীদের অভিযান বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ভয়াবহ বন্যায় নেপালের অবকাঠামোরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। দেশটির জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বন্যার পানিতে ৮০টি সেতু এবং ৪০ কিলোমিটার পাকা সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
চীনের সঙ্গে নেপালের সীমান্তবর্তী এলাকায় এসব সড়ক ও সেতুর অনেকগুলোই দুই দেশের মধ্যে পণ্য পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের পাশাপাশি পণ্য সরবরাহে বিঘ্নের অর্থনৈতিক প্রভাবও মোকাবিলা করতে হবে কর্তৃপক্ষকে।
প্রাথমিকভাবে ভূমিকম্পের কারণে ভূমিধস থেকে বন্যার সৃষ্টি হয়েছে বলে ধারণা করা হলেও পরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা জানায়, কোনো ভূকম্পন হয়নি। বরং একটি হিমবাহ ধসে পড়ার কারণেই ভয়াবহ বন্যার ঢেউ সৃষ্টি হয়েছে।
হিমবাহ ধসের নির্দিষ্ট কারণ এখনো জানা যায়নি। তবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয়ের হিমবাহ দ্রুত গলছে।
কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগারির ভূতত্ত্ববিদ ড্যানিয়েল শুগার বলেছেন, গত এক দশকে এ ধরনের ঘটনা আগের তুলনায় বেশি ঘটেছে, যার সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য সম্পর্ক রয়েছে। তবে এই বন্যার সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি সম্পর্ক নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
