জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ বণ্টন নিয়ে জাতীয় সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে বিতর্ক হয়েছে। তবে বিরোধী দলকে মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি পদ দেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে কোনো সমঝোতা হয়নি।
ঢাকা: জুলাই জাতীয় সনদ অনুসারে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ বণ্টন নিয়ে জাতীয় সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে বিতর্ক হয়েছে। রোববার রাতে অনির্ধারিত এই বিতর্ক হলেও বিরোধী দলকে মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি পদ দেওয়ার বিষয়ে কোনো সুরাহা হয়নি।
সরকারি দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিরোধী দল সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায় অংশ নিলে জুলাই সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী তাদের সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ দিতে আপত্তি নেই। এ জন্য সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধি দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে বিরোধী দল বলেছে, একটি কমিটিতে যোগ দেওয়ার শর্তে সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ দেওয়ার প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য নয়। তাদের দাবি, জুলাই সনদ অনুযায়ী সংসদে আসনের অনুপাতে মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির ২৬ শতাংশের সভাপতি পদ পাওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে।
অনির্ধারিত এই বিতর্কে বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম এবং বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের।
সংসদের রোববারের কার্যসূচিতে নতুন সংসদীয় কমিটি গঠনের কথা ছিল। তবে বিতর্কের পর নতুন কোনো কমিটি গঠন করা হয়নি। শুধু চারটি কমিটি পুনর্গঠন করা হয়।
জাতীয় সংসদে বর্তমানে বিষয়ভিত্তিক স্থায়ী কমিটি রয়েছে ১১টি এবং মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি রয়েছে ৩৯টি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে এখন পর্যন্ত ১৫টি সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলকে দেওয়া হয়েছে। এই কমিটির সভাপতি বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের।
বিদ্যমান ব্যবস্থায় বিরোধী দলকে সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। তবে রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসেবে সই করা জুলাই জাতীয় সনদে সরকারি হিসাব, বিশেষ অধিকার, অনুমিত হিসাব ও সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির সভাপতির দায়িত্ব বিরোধীদলীয় সদস্যদের দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
এ ছাড়া মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিগুলোর সভাপতি সংসদে আসনের সংখ্যানুপাতে বিরোধী দলের মধ্য থেকে নির্বাচনের প্রস্তাব রয়েছে। সংবিধানে এ বিধান যুক্ত করার কথাও সনদে বলা হয়েছে। বিএনপিসহ ৩০টি দল ও জোট এ প্রস্তাবে একমত হয়েছিল।
সংসদে বিরোধী দলের আসনের অনুপাত প্রায় ২৬ শতাংশ। সেই হিসাবে ৩৯টি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির মধ্যে প্রায় ১০টির সভাপতি পদ বিরোধী দলের পাওয়ার কথা। এর সঙ্গে সনদে সরাসরি উল্লেখ করা চারটি কমিটি যুক্ত হলে মোট ১৪টি কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলের পাওয়ার কথা।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, জুলাই সনদের এই প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংশোধন হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা জরুরি নয়। কারণ সংসদীয় কমিটির সভাপতি কোন দল থেকে নির্বাচিত হবেন, তা সংবিধান বা সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিতে নির্দিষ্ট করে দেওয়া নেই।
সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে গত ১৩ জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে জাতীয় সংসদ। বিরোধী দলকে ওই কমিটির জন্য পাঁচজনের নাম দিতে বলা হয়েছিল। তবে তারা কোনো নাম দেয়নি।
বিরোধী দল ওই কমিটি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, তারা জুলাই সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের পক্ষে। তবে সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে তাদের ধারণাগত মতভিন্নতা রয়েছে।
সংসদীয় কমিটি গঠন-সংক্রান্ত কার্যসূচিতে যাওয়ার আগে বক্তব্য দেন চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম। তিনি বলেন, বিরোধীদলীয় উপনেতার সঙ্গে টেলিফোনে কথা হয়েছে এবং সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে নাম দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
চিফ হুইপের বক্তব্য অনুযায়ী, এ কারণে সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটি পুনর্গঠন এবং নতুন সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠনের প্রস্তাব তখন উপস্থাপন করতে চাননি তিনি। একই সঙ্গে বিরোধীদলীয় উপনেতাকে এ বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।
পরে বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, সংসদে সদস্যসংখ্যার ভিত্তিতে সংসদীয় কমিটির সদস্য ও অন্যান্য পদ বণ্টনের বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছিল। আসন অনুপাতে কমিটিগুলোতে বিরোধী দলের ২৬ শতাংশ সদস্যপদ পেতে সমস্যা হচ্ছে না। কিন্তু এখন পর্যন্ত মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কোনো কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলকে দেওয়া হয়নি।
চিফ হুইপের সঙ্গে টেলিফোনে কথা হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও সংবিধান সংশোধন কমিটিতে নাম দেওয়ার কথা বলেননি বলে জানান তাহের। তাঁর বক্তব্য, একটি বিষয়কে অন্যটির সঙ্গে সম্পর্কিত করা ঠিক নয়।
জবাবে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম বলেন, জিয়াউর রহমানের সময় সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলকে দেওয়া হয়েছিল। এবারও ওই কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলকে দেওয়া হয়েছে। তবে অন্য কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলকে দেওয়ার রেওয়াজ নেই বলে তিনি দাবি করেন।
সরকারি দল ঐক্যবদ্ধভাবে সংবিধান সংশোধন করতে চায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিরোধী দল সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায় অংশ নিলে তাদের দাবি অনুযায়ী সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ দিতে সরকারি দল রাজি।
চিফ হুইপের বক্তব্যের জবাবে সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, বিরোধী দলের নীতিগত সিদ্ধান্ত হলো, তারা সরকারের সংবিধান সংশোধন কমিটিতে অংশ নেবে না।
একটি কমিটিতে যোগ দেওয়ার শর্তে সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ দেওয়ার প্রস্তাব সঠিক নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর দাবি, সংসদে আসনের অনুপাতে বিরোধী দলের ২৬ শতাংশ সভাপতি পদ পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
পরে বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, বিরোধী দলকে ডেপুটি স্পিকার পদের জন্য একজনের নাম দিতে বলা হয়েছিল। কিন্তু বিরোধী দল তখন ওই পদ নিতে চায়নি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এরপর সরকারি দল সিদ্ধান্ত নেয়, জুলাই জাতীয় সনদ পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত অর্থাৎ সংবিধান সংশোধিত হলে সে অনুযায়ী পদ বণ্টন করা হবে।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটিগুলোতে সংসদের আসনের সংখ্যানুপাতে বিরোধী দল সভাপতি পদ পাবে। তবে এর জন্য জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং সংবিধান সংশোধন করতে হবে।
বিরোধী দল বিশেষ কমিটিতে যোগ দিলে একই সঙ্গে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু করা এবং আসনের অনুপাতে তাদের সভাপতি পদ দিতে সরকারি দল রাজি বলেও জানান তিনি।
বিরোধী দলের উদ্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে বিভিন্ন দাবি করা হলেও সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা না করা পরস্পরবিরোধী অবস্থান।
দুই পক্ষের বক্তব্যের পর ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল দেশের স্বার্থে সরকারি ও বিরোধী দলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। প্রয়োজনে উভয় পক্ষের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে রুদ্ধদ্বার আলোচনা করারও অনুরোধ করেন তিনি।
