দীর্ঘ ১৭ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকার পর এবার ক্ষমতায় থেকেই বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত হচ্ছে। দলটির নেতাকর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নেতৃত্বের অনুপস্থিতি, মামলা-কারাবরণ, নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও বর্জন এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও সাংগঠনিক ঐক্য ধরে রাখতে পারাই বিএনপির ঘুরে দাঁড়ানোর অন্যতম কারণ।
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন সেনাপ্রধান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠার পর বিভিন্ন সময়ে দলটি রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে। তবে ২০০৭ সালের পরবর্তী সময়ে দলটি দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে ছিল। এবার সেই দীর্ঘ বিরতির পর ক্ষমতায় থেকেই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করছে দলটি।
১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের সময় বিএনপি একাধিকবার ভাঙনের মুখে পড়ে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পরবর্তী সময়ে দলটি সাংগঠনিকভাবে সেই সংকট কাটিয়ে ওঠে।
১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসে। পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে আওয়ামী লীগের আন্দোলনের মুখে ১৯৯৬ সালের মার্চে ক্ষমতা ছাড়তে হয়। এরপর ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে।
তবে ওই সরকারের সময় বিরোধী দলের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা, দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলা এবং জঙ্গি সংগঠনের উত্থানসহ বিভিন্ন ঘটনা ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক সংকটও ক্রমে তীব্র হয়।
২০০৬ সালের শেষ দিকে রাজনৈতিক সংকট ও সহিংসতার মধ্যে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসে। ওই সময়ে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াসহ দলটির অনেক নেতা গ্রেপ্তার হন।
২০০৮ সালে চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যে যাওয়ার পর তারেক রহমান আর দেশে ফেরেননি—তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পুরো সময় তিনি দেশের বাইরে ছিলেন। একই বছর অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বড় জয় পায় এবং বিএনপির ব্যাপক পরাজয় হয়।
এরপর আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করলে বিএনপি ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন করে। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি কয়েকটি দলের সঙ্গে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে অংশ নেয়। তবে অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ তুলে পরে সেই নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে দলটি। ২০২৪ সালের জানুয়ারির নির্বাচনও বিএনপি ও সমমনা দলগুলো বর্জন করে।
বিএনপির জন্য বড় সংকটগুলোর একটি ছিল ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়ার কারাবরণ। এরপর লন্ডনে অবস্থানরত তারেক রহমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দলের কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করেন।
পরে নির্বাহী আদেশে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পেলেও খালেদা জিয়া দীর্ঘ সময় বাসায় অবস্থান করেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রপতির আদেশে তার চূড়ান্ত মুক্তি হয়।
এরপর গত ডিসেম্বরে খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর দলের পূর্ণাঙ্গ চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন তারেক রহমান। এর আগে তিনি দেশে ফিরে এসেছিলেন এবং পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে।
দলের সিনিয়র নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের মতে, বিএনপির নীতি ও আদর্শের সঙ্গে জনগণের আকাঙ্ক্ষার মিল থাকায় কঠিন সময়েও দলটির প্রতি জনসমর্থন বজায় ছিল।
তিনি বলেন, জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা দলকে সংকটের সময় টিকিয়ে রাখতে ভূমিকা রেখেছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, খালেদা জিয়া স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে বিএনপিকে তৃণমূল পর্যন্ত নিয়ে গেছেন। পরবর্তী সময়ে ছাত্র ও যুব সংগঠন থেকে উঠে আসা নেতাকর্মীরাও দলের সাংগঠনিক ভিত্তি শক্ত রাখতে ভূমিকা রেখেছেন।
মোশাররফ হোসেনের মতে, গত ১৭ বছরে বিএনপির মূল শক্তি ছিল দলের ভেতর থেকে তৈরি হওয়া নেতা, কর্মী ও সমর্থকেরা। তাদের সাংগঠনিক ঐক্য দল ভাঙনের বিভিন্ন প্রচেষ্টা মোকাবিলায় সহায়তা করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ মনে করেন, রাজনৈতিক দলের ঐক্য অনেকাংশে নির্ভর করে কর্মীদের আদর্শিক অবস্থানের দৃঢ়তার ওপর। তার মতে, বিএনপিতে সেই আদর্শিক সংহতি তৈরি হওয়ায় দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও দলটি ঐক্য ধরে রাখতে পেরেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, বিএনপি এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছে, যেখানে একটি রাজনৈতিক দল ভেঙে যেতে পারে। চেয়ারপার্সন কারাগারে এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দেশের বাইরে থাকা সত্ত্বেও দলটি টিকে ছিল।
তার মতে, বিএনপির মধ্যপন্থী রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্যও দলটির টিকে থাকার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। আওয়ামী লীগ ও ধর্মভিত্তিক দলগুলোর মাঝামাঝি অবস্থানে বিএনপির একটি রাজনৈতিক জায়গা রয়েছে বলেও তিনি মনে করেন।
ফরিদপুরের বিএনপি সমর্থক মিরাজুল হাসান মনে করেন, গত ১৭ বছর ছিল দলটির জন্য এক ধরনের অগ্নিপরীক্ষা। তার মতে, ক্ষমতা হারানোর পর চরম সংকট থেকে বেরিয়ে এসে আবার ক্ষমতায় ফেরার অভিজ্ঞতা বিএনপির সাংগঠনিক চরিত্রেও পরিবর্তন এনেছে।
তিনি মনে করেন, বর্তমানে বিএনপি আরও বেশি ‘বিএনপি প্রজন্মের’ দলে পরিণত হয়েছে। দলের সর্বোচ্চ পর্যায়েও ছাত্রদল থেকে উঠে আসা নেতৃত্বের উপস্থিতি রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বিএনপি দীর্ঘ সময় ধরে অভিযোগ করে এসেছে যে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলটির বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে, অনেকে গুম ও হত্যার শিকার হয়েছেন। তবে এসব পরিস্থিতির মধ্যেও বিএনপি দীর্ঘ সময় সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে গেছে।
দলটির একাধিক নির্বাচন বর্জন, ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ, খালেদা জিয়ার কারাবরণ এবং তারেক রহমানের দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে অবস্থান—সব মিলিয়ে গত দেড় দশক ছিল বিএনপির জন্য কঠিন রাজনৈতিক সময়।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ব্যাখ্যায়, নেতৃত্বের প্রতি সমর্থন, সাংগঠনিক ঐক্য, তৃণমূলের সক্রিয়তা এবং দলের মধ্যপন্থী রাজনৈতিক অবস্থান শেষ পর্যন্ত বিএনপিকে সেই প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করেছে। দীর্ঘ ১৭ বছর পর ক্ষমতায় ফিরে এবার দলটি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করছে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায়।
