চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর এখনো পুরোপুরি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে আসেনি। গত মার্চে প্রশাসন ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ নেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর সেখানে পুলিশের তল্লাশিচৌকি ও দুটি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়মিত টহলও দিচ্ছে। তবে বিদ্যুৎ ও পানির মতো দৈনন্দিন সেবার বড় অংশ এখনো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে। পাশাপাশি ক্যাম্পে হামলা ও পানি সরবরাহের পাইপে বিষাক্ত দ্রব্য মেশানোর মতো ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও পুরোপুরি আতঙ্ক কাটেনি।
জঙ্গল সলিমপুরের এম এম পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের পাশের দোকানদার শাহ আলম স্থানীয় একটি সংগঠনের রসিদে বিদ্যুতের বিল পান। বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে তিনি কোনো বিল পাননি। গত মার্চে প্রশাসন ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ নেওয়ার পরও এই পদ্ধতির পরিবর্তন হয়নি।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) জানিয়েছে, জঙ্গল সলিমপুরে বিদ্যুতের বৈধ মূল সংযোগ রয়েছে মাত্র ২২টি। এসব সংযোগ থেকে অসংখ্য শাখা লাইন বসতিগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। তবে কোন সংযোগ বৈধ বা অবৈধ এবং কারা এর বিপরীতে টাকা সংগ্রহ করছে, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব পিডিবির কাছে নেই।
শাহ আলম জানান, স্থানীয় একটি সংগঠনের নামে কাগজে বিদ্যুৎ বিল আসে এবং সংগঠনটির এলাকায় থাকা ‘বিদ্যুৎ অফিসে’ তিনি নগদ টাকা দেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, টাকা সংগ্রহ করা হলেও এর পুরোটা সরকারি বিল হিসেবে জমা দেওয়া হয়নি। এর ফলে জুলাইয়ে টানা ১৫ দিন এলাকার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, জঙ্গল সলিমপুরের সংযোগগুলোর বিপরীতে বকেয়া ছিল ৭২ লাখ টাকা। পরে ৪৪ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়। বাকি ২৮ লাখ টাকা পরিশোধের জন্য প্রথমে ২০ আগস্ট পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ে টাকা পরিশোধ না হওয়ায় সময় বাড়িয়ে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছে।
বাসিন্দাদের কাছ থেকে নিয়মিত টাকা নেওয়ার পরও এত টাকা বকেয়া থাকার কারণ সম্পর্কে পিডিবি কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। পিডিবির ষোলশহর বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ছানা উল্লাহ জানিয়েছেন, জঙ্গল সলিমপুরের ২২টি সংযোগ প্রায় ২০ বছর আগে নেওয়া হয়েছিল। কীভাবে ও কোন বিবেচনায় এসব সংযোগ দেওয়া হয়েছিল, তা তাঁর জানা নেই।
পিডিবির কর্মীরা এখন বৈধ ও অবৈধ সংযোগ যাচাই করছেন। সব সংযোগ একসঙ্গে বিচ্ছিন্ন করলে পুলিশ ক্যাম্প, পানির পাম্প ও সরকারি কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। তাই যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
বিদ্যুতের মতো জঙ্গল সলিমপুরে কেন্দ্রীয় সরকারি পানি সরবরাহেরও পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা নেই। বিভিন্ন গভীর নলকূপ, পাম্প, জলাধার ও পাইপলাইনের মাধ্যমে বসতিতে পানি সরবরাহ করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, এসব পাম্প চালানো ও পাইপলাইন মেরামতের নামে নিয়মিত টাকা নেওয়া হয়। তবে কতটি পাম্প রয়েছে, সেগুলো কার জমিতে বা কার মিটারে চলে, কত পরিবার পানি ব্যবহার করে এবং সংগৃহীত টাকা কার কাছে জমা হয়—এসব বিষয়ে জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন বা কোনো পানি সরবরাহকারী সংস্থার সমন্বিত হিসাব নেই।
আলীনগরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্পেও পাশের একটি গভীর নলকূপ থেকে পাইপের মাধ্যমে পানি নেওয়া হতো। গত ২৬ জুলাই ওই পাইপলাইনে হামলার ঘটনা ঘটে। ট্যাংকের পানি গ্লাসে ঢালার সময় তিন পুলিশ সদস্য সাদা ফেনা দেখতে পান। পরে সেই পানি পান করে তাঁরা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে বলা হয়েছে, পানির পাইপ কেটে ভেতরে বিষাক্ত বা কীটনাশকজাতীয় পদার্থ ঢোকানো হয়েছিল। পরে কাটা অংশ প্লাস্টিক দিয়ে মুড়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে।
গত ৯ মার্চ জঙ্গল সলিমপুরে সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও অন্যান্য ইউনিটের ৩ হাজার ১৭৩ সদস্য যৌথ অভিযান চালান। অভিযানে ২২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় আগ্নেয়াস্ত্র, পাইপগান, গুলি, ককটেল, অস্ত্র তৈরির যন্ত্র ও নজরদারিতে ব্যবহৃত সিসি ক্যামেরা উদ্ধার করা হয়।
অভিযানের পর প্রবেশপথে তল্লাশিচৌকি এবং এস এম পাইলট ও আলীনগর উচ্চবিদ্যালয় এলাকায় দুটি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। এরপর চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার মো. জিয়াউদ্দীন জানিয়েছিলেন, জঙ্গল সলিমপুর পুরোপুরি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে।
তবে এর আড়াই মাসের মধ্যে ২৪ মে দিবাগত রাতে আলীনগরের যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটে। ক্যাম্প লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। পরে বুলডোজার দিয়ে চৌকির দেয়ালসহ বিভিন্ন অবকাঠামো ভেঙে ফেলা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যাতে দ্রুত সেখানে পৌঁছাতে না পারে, সে জন্য অন্তত চারটি স্থানে রাস্তা কেটে দেওয়া হয়েছিল।
পুলিশ ও জেলা প্রশাসন সূত্র অনুযায়ী, জঙ্গল সলিমপুরে অন্তত ৩০টি পাহাড় কেটে প্লট করা হয়েছে। আলীনগরে আড়াই কাঠার একটি প্লট প্রায় ৩০ লাখ টাকা এবং ছোট প্লট প্রায় ৫ লাখ টাকায় বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে।
স্থানীয়দের দাবি, প্রায় ২৬ হাজার ছোট প্লটের মধ্যে ২৩ হাজারই বিক্রি হয়েছে। এসব হিসাবের পূর্ণাঙ্গ নিবন্ধন বা বৈধ দলিল নেই। তবে প্লটের ক্রেতারা পরবর্তী সময়ে স্থানীয় বিদ্যুৎ ও পানি ব্যবস্থার গ্রাহকে পরিণত হয়েছেন।
২০২২ সালের ১২ সেপ্টেম্বর সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি সভার কার্যবিবরণীতে জঙ্গল সলিমপুরে ৩ হাজার ১০০ একর খাসজমির কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। সেখানে বলা হয়, এসব জমি পাহাড়খেকো, ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসীরা দখল করে অবৈধ বসতি ও স্থাপনা নির্মাণ করেছে।
চার বছর পর জেলা প্রশাসনের হিসাবে জঙ্গল সলিমপুরে খাসজমির পরিমাণ প্রায় ১ হাজার একর। বর্তমান জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেছেন, আগের ৩ হাজার ১০০ একরের হিসাবটি সলিমপুর ইউনিয়নের পাঁচটি মৌজার সম্মিলিত আয়তন হতে পারে।
তবে আগের হিসাব ভুল ছিল কি না, নাকি বর্তমান হিসাবেই ঘাটতি রয়েছে—এর কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। ফলে জঙ্গল সলিমপুরের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবির মধ্যেও সরকারি জমির হিসাবের এই অমিল এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
এদিকে চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম জানিয়েছেন, পুলিশ কর্মকর্তারা নিয়মিত জঙ্গল সলিমপুরে যাচ্ছেন এবং বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলছেন। তাঁদের মধ্যে আতঙ্ক যাতে না ছড়ায়, সে কারণে কিছু উদ্যোগ ধীরে ধীরে নেওয়া হচ্ছে।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক আবদুল কুদ্দুস চৌধুরীর দাবি, জঙ্গল সলিমপুর পুলিশ প্রশাসনের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তাঁর ভাষ্য, দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটলেও জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হয়েছে এবং ইয়াসিন, রোকনসহ তাঁদের সহযোগীদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
