রাজবাড়ী জেলা সদর হাসপাতালের বহির্বিভাগে প্রতিদিন হাজারের বেশি রোগী চিকিৎসা নিতে আসছেন। তাঁদের সেবা দিতে তিনটি পৃথক বহির্বিভাগে—শিশু, নারী ও পুরুষ—দুজন করে মোট ছয়জন চিকিৎসক দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে একজন চিকিৎসককে প্রতিদিন গড়ে দেড় শতাধিক রোগী দেখতে হচ্ছে।
হাসপাতালের মোট ৬৭টি চিকিৎসক পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ২৩ জন। শূন্য রয়েছে ৪৪টি পদ। দুই মাস ধরে বহির্বিভাগে ছয়জন চিকিৎসক রোগী দেখলেও রোগীর চাপ সামলাতে তাঁদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।
হাসপাতালের জুনিয়র কনসালট্যান্ট এবং ক্যাজুয়াল্টি অ্যান্ড ইমার্জেন্সি বিভাগের সুপারভাইজার রাজীব দে সরকার জানান, অর্ধেকের বেশি জনবলসংকট নিয়েই হাসপাতালের কার্যক্রম চলছে। বহির্বিভাগে প্রতিদিন হাজারের বেশি রোগী সেবা নেন। একজন চিকিৎসক দিনে প্রায় ২০০ রোগীও দেখছেন। একদিন তিনি নিজেই ৩৮৪ জন রোগী দেখেছেন।
রাজবাড়ী জেলার পাঁচটি উপজেলার মানুষের উন্নত চিকিৎসার অন্যতম ভরসাস্থল জেলা সদর হাসপাতালটি। ২০১৮ সালে হাসপাতালটি ১০০ শয্যা থেকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। ২০২০ সালে নতুন আটতলা ভবন নির্মাণ শুরু হয়। ২০২১ সালের জুনে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ভবনটির কাজ শেষ হয় ২০২৫ সালে। চলতি বছরের ১ মে থেকে ২৫০ শয্যার হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
তবে হাসপাতাল সূত্র জানায়, শয্যাসংখ্যা বাড়লেও নতুন করে জনবল দেওয়া হয়নি। আগের জনবল দিয়েই ২৫০ শয্যার কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। পুরোনো তিনতলা ভবনে রয়েছে ১০০ শয্যা। নতুন ১৫০ শয্যার ভবনের নিচতলায় বহির্বিভাগের টিকিট দেওয়া হয় এবং দোতলার কয়েকটি কক্ষে চিকিৎসকেরা রোগী দেখেন। নতুন ভবনের বেশির ভাগ কক্ষ এখনো ফাঁকা।
হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন ৩০ হাজার ৬৭৬ জন। জরুরি বিভাগে সেবা নিয়েছেন ৮ হাজার ৭৭২ জন। ওই মাসে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন ৪ হাজার ২৬ জন।
জুলাইয়ে বহির্বিভাগে রোগী ছিলেন ২৭ হাজার ৩৪৭ জন এবং ভর্তি রোগী ৪ হাজার ১৭ জন। এ সময়ে ১৭৬ জনকে অন্যত্র চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়। জরুরি বিভাগে সেবা নিয়েছেন ১১ হাজার ৯৬৮ জন, যাঁদের মধ্যে ৫৬ জনকে অন্যত্র পাঠানো হয়।
জুনে বহির্বিভাগে চিকিৎসা নেন ২৮ হাজার ৭৫০ জন এবং ভর্তি ছিলেন ৪ হাজার ৪৪৬ জন। তাঁদের মধ্যে ১৬৪ জনকে অন্যত্র পাঠানো হয়। জরুরি বিভাগে সেবা নেন ১৪ হাজার ২৮৩ জন এবং ৬২ জনকে অন্যত্র পাঠানো হয়।
হাসপাতালে প্রতিদিন বহির্বিভাগে হাজারের বেশি রোগী চিকিৎসা নেন। ভর্তি রোগীর সংখ্যাও দেড় শতাধিক।
হাসপাতালে ২২টি কনসালট্যান্ট পদের মধ্যে ১৪টিই শূন্য। এর মধ্যে ১০টি সিনিয়র কনসালট্যান্ট পদের সব কটিই খালি। ১২টি জুনিয়র কনসালট্যান্ট পদের চারটিও শূন্য।
এ ছাড়া ২৮ জন সহকারী সার্জন বা সমমান চিকিৎসকের মধ্যে ২০টি পদ, আটটি জরুরি চিকিৎসা কর্মকর্তার মধ্যে ছয়টি এবং চারটি চিকিৎসা কর্মকর্তার মধ্যে দুটি পদ খালি রয়েছে। প্যাথলজিস্ট ও রেডিওলজিস্টের একটি করে পদও শূন্য।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি মেডিসিন ও কার্ডিওলজি বিভাগে। প্রায় দেড় বছর ধরে এ দুটি বিভাগে কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই। প্রতিদিন হৃদ্রোগে আক্রান্ত পাঁচ থেকে ছয়জন রোগী ফরিদপুর বা ঢাকায় চলে যাচ্ছেন। মেডিসিনের নারী ও পুরুষ ওয়ার্ডে প্রতিদিন শতাধিক রোগী ভর্তি থাকলেও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ছাড়াই তাঁদের চিকিৎসা চলছে।
গত ২ সেপ্টেম্বর হাসপাতালের নতুন ভবনের দোতলায় গিয়ে প্রায় ২০০ নারী ও শিশু রোগীকে চিকিৎসকের জন্য অপেক্ষা করতে দেখা যায়।
সদর উপজেলার বসন্তপুর ইউনিয়নের রাজাপুর এলাকা থেকে ছেলেকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছিলেন গৃহবধূ রাশেদা বেগম। তাঁর ছেলে কয়েক দিন ধরে জ্বরে ভুগছিল। সকাল ৯টার মধ্যে হাসপাতালে এলেও বেলা ১১টা পর্যন্ত চিকিৎসক না আসায় তিনি ফরিদপুরে যাওয়ার কথা জানান।
রাজবাড়ী নাগরিক কমিটির সভাপতি জ্যোতি শংকর দ্রুত পর্যাপ্ত চিকিৎসক পদায়নের দাবি জানিয়েছেন। তাঁর মতে, হাসপাতালের অব্যবস্থাপনার কারণে জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা রোগীরা যথাযথ সেবা পাচ্ছেন না এবং দরিদ্র রোগীরা বেশি সমস্যায় পড়ছেন।
হাসপাতালে চিকিৎসকের পাশাপাশি চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরও ঘাটতি রয়েছে। চারটি অ্যাম্বুলেন্সের বিপরীতে দুজন চালকের পদ থাকলেও ২০২৪ সালের ৪ ডিসেম্বর একজন অবসরে যাওয়ার পর থেকে একজন চালকই দায়িত্ব পালন করছেন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হাসপাতাল, নালা, শৌচাগার ও সাতটি ওয়ার্ড ২৪ ঘণ্টা পরিষ্কার রাখতে ৭৫ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী প্রয়োজন। পদ রয়েছে সাতটি, এর মধ্যে পাঁচটিই শূন্য। ওয়ার্ড বয় ও অ্যাটেনডেন্ট প্রয়োজন ৩০ জন, কিন্তু আছেন মাত্র একজন। পাঁচটি নিরাপত্তা প্রহরীর পদের বিপরীতে কোনো কর্মী নেই। এসব কাজ আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে চালানো হচ্ছে।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক শেখ মোহাম্মদ আব্দুল হান্নান বলেন, চিকিৎসকসহ বিভিন্ন পদে জনবলসংকটের কারণে স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হচ্ছে। মেডিসিন ও হৃদ্রোগের বিশেষজ্ঞ না থাকায় এসব রোগীকে ফরিদপুর বা অন্যত্র যেতে হচ্ছে। চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর সংকটও প্রকট।
তিনি জানান, গত মে মাস থেকে ২৫০ শয্যার কার্যক্রম শুরু হলেও এখন পর্যন্ত নতুন জনবল পদায়ন করা হয়নি। তবে ১০০ শয্যার রোগীদের খাবার ২৫০ জনকে দেওয়া হচ্ছে।
