রাজধানীর আবদুল্লাহপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকার নিউ রংধনু আবাসিক হোটেলে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অভিযানের সময় আটক নারীদের মুখ দেখাতে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে। এ-সংক্রান্ত একটি ভিডিওতে পুলিশের দুজন নারী সদস্যকে কয়েকজন নারীকে ধরে মুখের কাপড় সরানোর চেষ্টা করতে দেখা যায়। ভিডিওতে এক নারীকে কাঁদতেও দেখা যায়।
গত ১২ আগস্ট ডিবির একটি দল নিউ রংধনু আবাসিক হোটেলে অভিযান চালায়। ওই সময় ভিডিওটি ধারণ করা হয়। ভিডিওতে আটক নারীদের কেউ শাড়ির আঁচল, কেউ মাস্ক, কেউ ওড়না আবার কেউ হাত দিয়ে মুখ ঢাকার চেষ্টা করছিলেন।
ভিডিওতে পুলিশের পক্ষ থেকে নারীদের উদ্দেশে বলতে শোনা যায়, ‘সব খোল, সব খোল, এই মাস্ক খোল, ঢাকবি না, ঢাকলে কিন্তু মাইর হবে।’
ভিডিওটি পরে ইউটিউবার ও কিছু সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হয়। এ ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে, কোনো ব্যক্তি ভিডিওতে নিজের চেহারা দেখাতে না চাইলে পুলিশ তাকে মুখ দেখাতে বাধ্য করতে পারে কি না।
নিউ রংধনু আবাসিক হোটেলে ওই অভিযানের সময় ডিবির উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইলিয়াস কবির উপস্থিত ছিলেন। পুলিশ সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, আটক নারীদের মুখ ঢাকতে বাধা দেওয়ার নির্দেশ তিনি দিয়েছিলেন। একটি ভিডিওতেও তাঁকে মাস্ক পরা অবস্থায় এ কথা বলতে শোনা যায়।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ইলিয়াস কবির। ২ সেপ্টেম্বর তিনি বলেন, আটক ব্যক্তিদের পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনে তাঁদের মাস্ক সরাতে বলা হতে পারে। তাঁর দাবি, পুলিশের কোনো সদস্য তাঁদের মুখ দেখাতে বাধ্য করেননি।
ইলিয়াস কবির বলেন, অনেক সময় গণমাধ্যমকর্মীরা ভিডিওতে ব্যক্তিদের মুখ দেখানোর চেষ্টা করেন এবং ভিউয়ের জন্য সেসব ভিডিও ফেসবুকে প্রচার করেন। পুলিশ সদস্যদের নারীদের মুখের কাপড় সরাতে বাধ্য করার দৃশ্য ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে—এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু করা হয়নি। তাঁর ভাষ্য, কাজ করতে গিয়ে মানুষের ছোটখাটো ভুল হতে পারে।
নিউ রংধনু আবাসিক হোটেলের অভিযানের ভিডিও ছাড়াও হোটেল, পানশালা, বার, ফ্ল্যাট এবং তল্লাশিচৌকিতে পুলিশের বিভিন্ন অভিযানের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশ ও ইউটিউবারদের সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, কিছু পুলিশ কর্মকর্তা অভিযানের আগে ইউটিউবারদের ডেকে নেন। পরে ইউটিউবার ও কিছু সংবাদমাধ্যম এসব ভিডিও প্রচার করে ভিউ অর্জন করেন এবং সেখান থেকে আয়ও হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাইফুল আলম চৌধুরী মনে করেন, পুলিশি অভিযানে ইউটিউবার বা সাংবাদিকদের সঙ্গে নেওয়া উচিত নয়। তাঁর মতে, অভিযান শেষে পুলিশ সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তথ্য জানাতে পারে। তিনি বলেন, ভিউ পাওয়ার জন্য কিছু সাংবাদিক অনৈতিক বা বেআইনি কাজে অংশ নিচ্ছেন এবং সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলোর এ বিষয়ে নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব রয়েছে।
মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবীদের মতে, আটক ব্যক্তিদের মুখ দেখাতে বাধ্য করার এমন আচরণ নাগরিক অধিকারের লঙ্ঘন।
মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নূর খান বলেন, কোনো নারী অপরাধ করলে তাঁর বিচার হবে এবং আদালত তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে শাস্তি দেবেন। কিন্তু বিচার হওয়ার আগেই পুলিশ যদি একধরনের শাস্তির ব্যবস্থা করে, তা বেআইনি।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদে কাউকে যন্ত্রণা দেওয়া, নিষ্ঠুর, অমানবিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেওয়া কিংবা এ ধরনের আচরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ২০১২ সালের ১১ ডিসেম্বর গ্রেপ্তার বা সন্দেহভাজন হিসেবে আটক কোনো ব্যক্তিকে গণমাধ্যমের সামনে হাজির না করার নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তাদের দায়িত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার বিষয়ে আদালত তখন রুলও জারি করেন।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে পুলিশ, র্যাব, বিজিবিসহ বিভিন্ন বাহিনী সংবাদমাধ্যমে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে আটক বা গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মুখমণ্ডল অস্পষ্ট করে দেওয়ার চর্চা শুরু করে। তবে ভিডিওতে কিছু কর্মকর্তাকে আটক ব্যক্তিদের মুখ দেখাতে বাধ্য করার দৃশ্য দেখা যাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, এ ধরনের আচরণ আইন অনুমোদন করে না। উদ্দেশ্য যা-ই হোক, এমন বেআইনি চর্চা বন্ধ করা উচিত।
