সমুদ্রের নোনা পানি পরিশোধন করে সুপেয় পানি তৈরির কয়েকটি প্রধান প্ল্যান্ট সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বড় ধরনের পানি সংকটে পড়েছে ইসরাইল। ভূমধ্যসাগরে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া মাইক্রোঅ্যালজির কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। দেশটির জাতীয় পানি কোম্পানি মেকোরোতের তথ্য অনুযায়ী, ছয়টি উপকূলীয় ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্টের মধ্যে পাঁচটিই সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
মেকোরোতের মুখপাত্র লিয়র গুতমান ঘটনাটিকে অত্যন্ত বিরল বলে উল্লেখ করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইসরাইলে এর আগে এমন ঘটনা দেখা যায়নি। কয়েকটি প্ল্যান্ট আংশিকভাবে আবার চালু হলেও সংশ্লিষ্ট সময়ে মাত্র একটি প্ল্যান্ট পূর্ণ সক্ষমতায় চলছিল।
ইসরাইলের বেন-গুরিয়ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পানি গবেষণা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এদো বার-জিভের মতে, উপকূলজুড়ে ছড়িয়ে পড়া বিশাল দূষণের বিষয়টি পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা জানতে পারেন, এর পেছনে রয়েছে মাইক্রোঅ্যালজি বা ক্ষুদ্র শৈবাল।
সূর্যালোক, কার্বন ডাইঅক্সাইড ও পানির পুষ্টি উপাদান ব্যবহার করে এসব ক্ষুদ্র জীব দ্রুত বেড়ে উঠতে পারে। বার-জিভের হিসাব অনুযায়ী, শৈবাল অন্তত ১২ মাইল এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এর উৎপত্তি নীল নদের ব-দ্বীপে এবং সমুদ্রের স্রোতের সঙ্গে এটি ইসরাইলের উপকূলের দিকে এসেছে।
২০ বছর ধরে উপকূলীয় পানির ওপর গবেষণা করা বার-জিভ জানান, এত বড় পরিসরে এমন ঘটনা তিনি এই প্রথম দেখেছেন।
ইসরাইলের বেশিরভাগ ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্টে ‘রিভার্স অসমোসিস’ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় প্রথমে পানির বড় দূষণকারী উপাদান সরানো হয়। এরপর বিশেষ পর্দার মধ্য দিয়ে পানি প্রবাহিত করে লবণ, ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য কণা ছেঁকে সুপেয় পানি তৈরি করা হয়।
উটাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডল ইস্ট সেন্টারের পরিচালক মাইকেল ক্রিস্টোফার লোর মতে, শৈবাল ও এর তৈরি উপাদান এসব পর্দা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। পানিতে ভাসমান উপাদানের পরিমাণ বেশি হলে পরিশোধন ব্যবস্থার ওপরও চাপ তৈরি হয়।
২০০৮ ও ২০০৯ সালে ওমান উপসাগরে ক্ষতিকর শৈবাল বিস্তারের ‘রেড টাইড’ ঘটনার সময়ও ওই অঞ্চলের বেশ কয়েকটি ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
প্ল্যান্টগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ঘাটতি মোকাবিলায় সরকারি পানি ব্যবস্থাকে কাজে লাগানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মেকোরোতের গুতমান। এর মধ্যে গ্যালিলি সাগর থেকে পানি সংগ্রহ, ভূগর্ভস্থ কূপ চালু করা এবং জাতীয় পানি মজুত ব্যবহারের ব্যবস্থা রয়েছে।
কিছু শহরে বাগানে সেচ ও সুইমিং পুলে পানি ভরার মতো কাজে স্বল্পমেয়াদি স্থানীয় বিধিনিষেধও দেখা গেছে। তবে মেকোরোতের ভাষ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে সেচের কাজে খাবার পানির মানের পানি ব্যবহার করা কৃষকদের ওপর।
মেকোরোতের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক শৈবাল বিস্তারের পেছনে ‘অত্যন্ত অস্বাভাবিক’ কয়েকটি পরিবেশগত উপাদানের সমন্বয় ছিল। এর মধ্যে একটি সমুদ্রঝড় পানির ঘোলাত্ব বাড়িয়ে দেয় এবং সমুদ্রের তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি পর্যন্ত বাড়ে।
ইসরাইলের সমুদ্র বিজ্ঞান ও লিমনোলজি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সামুদ্রিক বাস্তুবিজ্ঞানী তামার গাই-হাইম বলেন, পুষ্টি উপাদান, তাপমাত্রা, আলো, স্রোত ও পানির মিশ্রণসহ বিভিন্ন পরিবেশগত উপাদান একসঙ্গে অনুকূল হলে এ ধরনের শৈবাল বিস্তার ঘটতে পারে।
বার-জিভ মনে করেন, এ ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে আবারও ঘটতে পারে। তার মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এ ধরনের পরিস্থিতি আরও ঘন ঘন দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তীব্র তাপ ও খরা বাড়ায় পানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে পানি উৎপাদনে ডিস্যালিনেশনের ওপর নির্ভরতা ক্রমেই বাড়ছে। তবে একটি কেন্দ্রীভূত প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকিও এই ঘটনা সামনে এনেছে।
মাইকেল ক্রিস্টোফার লো মনে করেন, সাম্প্রতিক পরিস্থিতি ডিস্যালিনেশন ব্যবস্থার বড় ধরনের বিঘ্নের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
প্রাকৃতিক ও জলবায়ুজনিত কারণের পাশাপাশি সামরিক ও সাইবার হুমকিও ডিস্যালিনেশন অবকাঠামোর জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এ ছাড়া তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাও বড় উদ্বেগের বিষয় বলে উল্লেখ করেছেন বার-জিভ। তার মতে, তেল দূষণ হলে মাইক্রোঅ্যালজির বর্তমান বিস্তারের তুলনায় আরও দীর্ঘ সময় প্ল্যান্ট বন্ধ রাখতে হতে পারে।
