শেখ হাসিনা সরকারের আমলে স্বাক্ষরিত বাংলাদেশ ও ভারতের ১০১টি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক পর্যালোচনার খবরের বিষয়ে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে ভারত।
শুক্রবার নয়াদিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল।
তিনি বলেন, চুক্তিগুলো পর্যালোচনার বিষয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ভারতের নজরে এসেছে। তবে এ বিষয়ে ঢাকার পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো যোগাযোগ করা হয়নি। একই সঙ্গে ভারত তার স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে বলেও জানান তিনি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রায় ১০১টি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। বর্তমানে এসব চুক্তি ও সমঝোতা পর্যালোচনা করছে বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ।
কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাধ্যতামূলক নয় এমন সমঝোতা স্মারক এবং অবকাঠামো-সংক্রান্ত শর্তগুলো বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে। তবে সব চুক্তি একসঙ্গে বাতিলের কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি। প্রতিটি প্রকল্প আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
আগের চুক্তিগুলোর আওতায় ভারতকে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার করে দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে পণ্য পরিবহনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে এসব পণ্য পরিবহনের মাশুল ও রুট ব্যবহারের সুবিধা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগের শর্তগুলো ভারসাম্যপূর্ণ ছিল কি না, সেটিও মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ভারতের কাছ থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের ওপরও নির্ভরশীল। এর মধ্যে আদানি পাওয়ারের গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং আন্তঃসীমান্ত ডিজেল পাইপলাইন রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের কারণে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির অর্থ পরিশোধে বিলম্ব এবং আর্থিক শর্ত পুনর্নির্ধারণের অনুরোধের বিষয়টি সামনে এসেছে।
বাংলাদেশের রেল, সড়ক ও বন্দর প্রকল্পে বিভিন্ন ঋণসীমার আওতায় ভারত ৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ সহায়তা দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অর্থায়নে পরিচালিত কয়েকটি প্রকল্প বর্তমানে বাংলাদেশের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের আওতায় রয়েছে।
কর্মকর্তাদের মতে, প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব, বরাদ্দ না হওয়া অর্থ বাতিল অথবা ক্রয়সংক্রান্ত শর্তে পরিবর্তন হলে ভারতীয় অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার বিষয়েও সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন করা হয়। জয়সওয়াল বলেন, দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে পানি-সংক্রান্ত প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাগুলো কার্যকর রয়েছে।
১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিটির মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। পানি-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে দুই দেশের যৌথ নদী কমিশনের মাধ্যমে কারিগরি পর্যায়ে নিয়মিত বৈঠক হচ্ছে বলেও জানান ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র।
তিস্তা ও অন্যান্য অভিন্ন নদীর পানি নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের আলোচনা দ্বিপক্ষীয় যৌথ নদী কমিশন এবং বিদ্যমান কাঠামোবদ্ধ সংলাপ ব্যবস্থার মাধ্যমে অব্যাহত থাকবে বলে এর আগে জানিয়েছিল ভারত।
সংবাদ সম্মেলনে জয়সওয়াল বলেন, বাংলাদেশ ও ভারত ৫৪টি অভিন্ন নদী ভাগাভাগি করে এবং পানি-সংক্রান্ত বিষয়গুলো বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে সমাধান করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৯৬ সালের গঙ্গা চুক্তির মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কা ব্যারাজে পানির বণ্টন পরিচালিত হয়। তবে তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে একাধিক দফা আলোচনা হলেও বিষয়টি এখনো অমীমাংসিত রয়েছে।
এর আগে ১১ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি জানিয়েছিলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারতের সঙ্গে সম্পাদিত ১০১টি চুক্তি বর্তমান সরকার পর্যালোচনা করছে। এসব চুক্তিতে দেশের স্বার্থবিরোধী কোনো শর্ত বা বিষয় রয়েছে কি না, তা যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
পরে ১৩ সেপ্টেম্বর এ বিষয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, এসব স্মারক ও চুক্তি জাতীয় সংসদীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা ও পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
