কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার বঙ্গসোনাহাট ইউনিয়নে সারের দাবিতে আন্দোলনের ঘটনায় করা মামলার পর অন্তত পাঁচটি গ্রামের কৃষকদের মধ্যে গ্রেপ্তার ও হয়রানির আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। অনেক কৃষক রাতে বাড়িতে না থেকে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে থাকছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
চলতি মাসের শুরুতে সারের দাবিতে বিক্ষোভের সময় উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে কিছু সময়ের জন্য অবরুদ্ধ করার ঘটনায় মামলাটি করা হয়। এতে ১১ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতপরিচয় আরও ৫০ থেকে ৬০ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া দুজন কৃষক আট দিন কারাগারে থাকার পর জামিনে মুক্তি পেয়েছেন।
গত ৭ সেপ্টেম্বর বঙ্গসোনাহাট ইউনিয়নের গোনাইয়ের কুটি গ্রামে সার ডিলার আমজাদ হোসেনের দোকানের সামনে শত শত কৃষক জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন।
কৃষকদের অভিযোগ, আমন ধান চাষের মৌসুমে সারের চাহিদা বেশি থাকলেও তাদের মাত্র পাঁচ থেকে সাত কেজি করে সার দেওয়া হচ্ছিল। কয়েকবার দোকানে গিয়েও সার না পাওয়ার অভিযোগ করেন অনেকে। কেউ কেউ স্বজনপ্রীতির অভিযোগও তোলেন।
একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা বাঁশ ও আবর্জনায় আগুন দিয়ে সড়ক অবরোধ করেন। পরে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবদুল জব্বার ঘটনাস্থলে গেলে একদল কৃষক তাকে কিছু সময়ের জন্য অবরুদ্ধ করে রাখেন। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে। পরদিন তিনি ভূরুঙ্গামারী থানায় মামলা করেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মামলার পর কয়েকটি গ্রামে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক পুরুষ দিনের বেলা মাঠে কাজ করলেও রাতে আত্মীয়দের বাড়িতে অবস্থান করছেন। গ্রেপ্তারের ভয়ে কেউ কেউ সার ডিলারের কাছেও যাচ্ছেন না।
গোনাইয়ের কুটি মধ্যপাড়া গ্রামের শিউলি বেগম জানান, মামলায় নাম আসার পর ৮ সেপ্টেম্বর থেকে তাঁর স্বামী সুলতান মোল্লা বাড়িতে থাকছেন না। দেড় বিঘা জমিতে আমন ধান এবং এক বিঘা জমিতে বেগুন চাষ করলেও অনিশ্চয়তার কারণে নিয়মিত জমিতে যেতে পারছেন না বলে জানান তিনি।
কৃষক কলিম উদ্দিনও জানান, মামলায় তাঁর ছোট ভাই আবদুস সালামের নাম থাকায় তিনি বাড়িছাড়া হয়েছেন। কলিমের ভাষ্য, তিনিও দিনে মাঠে কাজ করলেও রাতে আত্মীয়ের বাড়িতে থাকছেন।
মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া দুই কৃষকের মধ্যে আল আমিন মোল্লা আট দিন কারাগারে থাকার পর জামিনে মুক্ত হন। তাঁর স্ত্রী রওশন আরা বেগম জানান, স্বামীকে ছাড়িয়ে আনতে প্রায় ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। আরেক কৃষক সুরুজ মিয়াও আট দিন কারাগারে থাকার পর জামিনে বাড়ি ফিরেছেন।
বঙ্গসোনাহাট ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য জহুরুল ইসলাম ও সাবেক চেয়ারম্যান শাহজাহান আলী মোল্লা মামলাটি প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের দাবি, সারের সংকট নিয়ে কৃষকদের মধ্যে প্রতিবছরই বিরোধ দেখা দেয়।
অন্যদিকে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবদুল জব্বার বলেন, বিক্ষোভের সময় তাঁর ওপর হামলা হয়েছিল এবং বিষয়টি এখন পুলিশের হাতে।
ভূরুঙ্গামারী থানার ওসি আজিম উদ্দিন বড় পরিসরে অভিযান চালানোর বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, কোনো নির্দোষ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হবে না। ঘটনার ভিডিও ফুটেজ দেখে আসামিদের শনাক্ত করা হচ্ছে।
ভূরুঙ্গামারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অমৃতা দেবনাথ বলেন, মামলার কারণে কোনো কৃষক বাড়ি ছেড়েছেন—এমন তথ্য তাঁর কাছে নেই।
কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। তাঁর বক্তব্য, যারা দোষী নন, তাদের ভয় পাওয়ার কারণ নেই।
