সাভারের আশুলিয়ায় প্রীতি কম্পোজিট লিমিটেড কারখানার সামনে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে সাতজন নিহত হওয়ার ঘটনায় মেয়াদোত্তীর্ণ ও অকেজো সিলিন্ডার অবৈধভাবে মজুতের অভিযোগ উঠেছে। কারখানা সূত্রের দাবি, বয়লার চালানোর জন্য আগের রাতে ১১টি গাড়িতে সিএনজি ও এলপিজি সিলিন্ডার আনা হয়েছিল। সেগুলো আনলোড করার সময় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
তবে বিস্ফোরণের কারণ নিয়ে কারখানা কর্তৃপক্ষ ও বিদ্যুৎ বিভাগের বক্তব্যে ভিন্নতা দেখা দিয়েছে। কারখানা কর্তৃপক্ষের দাবি, বাইরে থাকা ১১ কেভি বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের ট্রান্সফার থেকে সৃষ্ট স্পার্কের প্রভাবে এলপিজি সঞ্চালনব্যবস্থায় আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। ঢাকা পল্লীবিদ্যুৎ-১ কর্তৃপক্ষ এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।
কারখানার একটি সূত্র জানায়, বিস্ফোরণের আগে ১১টি কাভার্ডভ্যানে করে সিএনজি ও এলপিজি সিলিন্ডার আনা হয়। সাভারের লালন সিএনজি পাম্প, হেমায়েতপুর এলপিজি গ্যাস স্টেশন, রেডিও কলোনি সারাহা ফিউল স্টেশনসহ স্থানীয় কয়েকটি পাম্প থেকে এসব গ্যাস সংগ্রহ করা হয়েছিল।
সূত্রটির দাবি, কারখানার বয়লার চালাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এসব সিলিন্ডার আনা হয়। সিলিন্ডারগুলোর বেশিরভাগই মেয়াদোত্তীর্ণ ও দীর্ঘদিন ব্যবহারের কারণে প্রায় অকেজো হয়ে পড়েছিল। আনলোড করার সময় সেগুলো থেকেই বিস্ফোরণ ঘটে বলে সূত্রটি জানায়।
সাভার মডেল থানার ওসি সাইফুল আলম বলেন, রাতে বিভিন্ন সিএনজি ও এলপিজি পাম্প থেকে গ্যাস ভরে নেওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ। এ ধরনের অপরাধের জন্য মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে শাস্তির বিধান রয়েছে।
সাভারের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম জানান, বিস্ফোরক অধিদপ্তরের ২০১২ সালের একটি পরিপত্র অনুযায়ী ফুয়েল পাম্প থেকে এভাবে যাকে-তাকে গ্যাস সরবরাহের সুযোগ নেই। নিয়ম মেনে চললে বিপুল পরিমাণ গ্যাস এভাবে নেওয়া সম্ভব নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সোমবার ঘটনাস্থল পরিদর্শনে দেখা যায়, বিস্ফোরণে আশপাশের বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গ্যাস সিলিন্ডারের টুকরার আঘাতে অন্তত ৩০টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিস্ফোরণের পর কারখানায় তিন দিনের ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, বিস্ফোরণে সাতজন নিহত এবং অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। আহতদের অনেকে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের আরও অভিযোগ, তদন্ত কমিটি গঠনের আগেই পরিচ্ছন্নতাকর্মী দিয়ে ঘটনাস্থল পরিষ্কার করিয়ে বিস্ফোরণের গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্ট করা হয়েছে।
বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করতে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। সংস্থাটির সহকারী পরিচালক কাজী নজমুজ্জামানের নেতৃত্বে গঠিত কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, কারখানার সামনে একটি কাভার্ডভ্যানে রাখা সিলিন্ডারগুলো একের পর এক বিস্ফোরিত হতে থাকে। এতে প্রথমে ওই গাড়িতে আগুন ধরে যায়। পরে আগুন আশপাশে থাকা অন্যান্য গাড়িতে ছড়িয়ে পড়লে সেগুলোতে রাখা গ্যাস সিলিন্ডারও বিস্ফোরিত হয়।
ঘটনায় কারখানার শ্রমিক, আশপাশের সবজি বিক্রেতা ও পথচারীরা হতাহত হন। ফায়ার সার্ভিসের কয়েকটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে কয়েক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
নিহতদের মধ্যে পুলিশ দুজনের পরিচয় শনাক্ত করেছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ সূত্রে আরও একজনের পরিচয় জানা গেছে। তারা হলেন—কারখানার আশপাশের ফুটপাতের ব্যবসায়ী বুলবুল হোসেন (৪৫), নজরুল ইসলাম (৪২) এবং চা দোকানের পাশে থাকা মোসাম্মাৎ জয়নব (৫৫)।
জয়নব গাজীপুরের কাশিমপুর এলাকার মোহাম্মদ আলীর স্ত্রী। সোমবার সকালে ময়নাতদন্ত শেষে তার মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। অন্য নিহতদের মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রয়েছে।
বিস্ফোরণে হতাহতদের খোঁজ নিতে সোমবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শন করেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান। এ সময় তিনি নিহত নজরুল ইসলামের পরিবারের হাতে ৫০ হাজার টাকা তুলে দেন।
মন্ত্রী বলেন, সরকার এ কঠিন সময়ে নিহত ও আহতদের পরিবারের পাশে রয়েছে। আহতদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
