যান্ত্রিকতার দ্রুতগতির এই সময়ে মোবাইল ও অ্যালগরিদমনির্ভর যোগাযোগের কারণে হাতে লেখা চিঠির অভিজ্ঞতা ক্রমেই বিরল হয়ে উঠছে। এমন বাস্তবতায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) বটতলায় বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে আয়োজিত ফুড ফেস্টিভ্যালে ‘চিঠি বক্স’ যুক্ত করেছে ভিন্নমাত্রা।
খাবার ও পর্যটনকেন্দ্রিক এই আয়োজনে রাখা ডাকবাক্সে শিক্ষার্থী ও দর্শনার্থীরা নিজেদের চিন্তা, অনুভূতি ও স্বপ্ন লিখে জমা দিচ্ছেন। মোবাইলে মুহূর্তের মধ্যে বার্তা পাঠানোর যুগে হাতে লেখা চিঠির এই উদ্যোগ অনেকের কাছেই নতুন অভিজ্ঞতা হয়ে উঠেছে।
বাক্সের পাশে রাখা হয়েছে রঙিন কাগজ। আগ্রহীরা সেখানে নিজেদের কথা লিখে ভাঁজ করে ডাকবাক্সে ফেলছেন। বাক্সে থাকা পোস্টারে লেখা হয়েছে—নিজের চিন্তা, অনুভূতি ও স্বপ্ন এখানে রেখে যেতে। আয়োজনে থাকা শিক্ষার্থীরা দর্শনার্থীদের চিঠি লেখার প্রক্রিয়ায় সহায়তা করছেন। পথচলতি অনেকেও কৌতূহলী হয়ে সেখানে দাঁড়াচ্ছেন।
উৎসবের সূচনা হয় ২৭ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টায় ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ থেকে বের হওয়া একটি বর্ণাঢ্য র্যালির মাধ্যমে। র্যালিতে শিক্ষার্থীরা বাঙালির সংস্কৃতি ও গ্রামীণ জীবনের বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী রূপ তুলে ধরেন।
অংশগ্রহণকারীদের কেউ বর-বউ, কেউ কিষান-কিষানি, কেউ বাউল আবার কেউ জমিদার-জমিদারপত্নীর সাজে অংশ নেন। আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও গ্রামীণ নারীর সাজেও অংশগ্রহণকারীদের দেখা যায়। পাশাপাশি শেফ, এয়ার হোস্টেস, ওয়েটার ও ট্যুরিস্ট পুলিশের পোশাকে পর্যটন খাতের বিভিন্ন পেশাও তুলে ধরা হয়। ঐতিহ্য ও আধুনিক পর্যটনের এই সমন্বিত রূপ নিয়ে র্যালিটি বটতলায় এসে শেষ হয়।
ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের আয়োজনে অনুষ্ঠিত ফুড ফেস্টিভ্যালের উদ্বোধন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ কে এম মতিনুর রহমান। বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. মাসুদ রানা জানান, তিন দিনব্যাপী এই আয়োজন চলবে।
এবারের আয়োজনের প্রতিপাদ্য ‘ডিজিটাল এজেন্ডা অ্যান্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ফর ট্যুরিজম’। এ প্রতিপাদ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বটতলায় রোবটের আদলে তৈরি একটি কাটআউট রাখা হয়েছে। এর এক হাতে বার্গার ও অন্য হাতে রয়েছে পিৎজা।
পর্যটন খাতে প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান ব্যবহার এবং আতিথেয়তা সেবায় যন্ত্রের উপস্থিতির বিষয়টি এই সাজসজ্জায় তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি পালকির আদলে তৈরি একটি ছবি তোলার ফ্রেমও রাখা হয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর উপস্থাপনার সঙ্গে গ্রামীণ নান্দনিকতার সমন্বয় ঘটিয়েছে এসব আয়োজন।
ফুড ফেস্টিভ্যালের স্টলগুলোও সাজানো হয়েছে ভিন্নধর্মী নামে। এর মধ্যে রয়েছে ভ্রমণকুঞ্জ, পাঁচফোড়ন, পকেট বাইটস, লিটল পার্লিস, তাউফা ক্রিয়েশন ও সিশেল। স্টলগুলোর ব্যানারে লেখা রয়েছে, ‘দাম থাকবে নাগালে, স্বাদ থাকবে মনে’।
এসব স্টলে দেশীয় ও বিদেশি খাবারের পাশাপাশি পর্যটনসংশ্লিষ্ট সামগ্রী, গাইডসহ বিভিন্ন উপকরণ প্রদর্শন করা হচ্ছে। পাঁচফোড়ন স্টলের সামনে থাকা ‘আপনার মন্তব্য’ বোর্ডে দর্শনার্থীরা রঙিন চিরকুটে খাবার সম্পর্কে নিজেদের মতামতও জানাচ্ছেন।
খাবারের ঘ্রাণ, ছবি তোলার ভিড় ও রোবটের হাতে থাকা পিৎজার পাশেই বটতলার এক কোণে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে হলুদ চিঠি বক্সটি। সেখানে জমা পড়ছে প্রিয়জনের জন্য বার্তা, ব্যক্তিগত অনুভূতি ও নানা ভাবনা।
প্রযুক্তি, খাবার ও সংস্কৃতির এই আয়োজনে হাতে লেখা কয়েকটি লাইন তাই যোগ করেছে আলাদা এক মানবিক অনুভূতি।
