নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে দ্রুত অগ্রসর হলেও জার্মানিতে আবারও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বৈশ্বিক গ্যাসবাজারে মূল্যবৃদ্ধি এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে দেশটির কিছু রাজনৈতিক ও শিল্পমহল কয়লার ব্যবহার দীর্ঘায়িত করার পক্ষে মত দিচ্ছে।
ইউরোপে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার সবচেয়ে বড় ব্যবহারকারী জার্মানি বহু আগেই কয়লার যুগ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। দেশটি ২০৩৮ সালের মধ্যে সম্পূর্ণভাবে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ করার পরিকল্পনা নিয়েছে। তবে সবচেয়ে দূষণকারী লিগনাইট বা বাদামি কয়লার ব্যবহার ২০৩০ সালের মধ্যেই বন্ধ করার ঘোষণা রয়েছে।
বর্তমানে জার্মানির মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ২০ শতাংশ আসে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে। একই সময়ে নবায়নযোগ্য উৎস—বিশেষ করে বায়ু ও সৌরশক্তি—দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে। ২০২৫ সালে দেশটির মোট বিদ্যুতের প্রায় ৫৯ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে এসেছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভবিষ্যতে কয়লার পরিবর্তে প্রাকৃতিক গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ব্যাকআপ হিসেবে ব্যবহৃত হবে। বর্তমানে গ্যাস থেকে প্রায় ১৩ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয় এবং এটি কয়লার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম কার্বন নিঃসরণ করে।
সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেক দেশ আবারও কয়লার দিকে ঝুঁকছে। জাপান কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার নিয়ম শিথিল করেছে, ইতালি বিদ্যমান কেন্দ্র বন্ধের সময়সীমা পিছিয়েছে, আর ভারতও কিছু কয়লাভিত্তিক স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণ স্থগিত করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে জার্মানিতেও প্রশ্ন উঠছে—দেশটি কি নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী কয়লা বিদায় দেবে, নাকি জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে কিছু সময়ের জন্য পরিকল্পনা শিথিল করবে?
জার্মানির হাতে রয়েছে ইউরোপের সবচেয়ে বড় লিগনাইট মজুত এবং বিশ্বে এ ক্ষেত্রে তৃতীয় বৃহত্তম অবস্থান। দেশটি এই জ্বালানিতে প্রায় সম্পূর্ণ স্বনির্ভর।
অন্যদিকে, ব্যবহৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ৯৫ শতাংশ আমদানি করতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম বেড়ে গেলে স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য ও তুলনামূলক সস্তা লিগনাইট অর্থনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
এ ছাড়া ২০২৩ সালে জার্মানি তাদের সর্বশেষ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রও বন্ধ করে দিয়েছে, ফলে বিকল্প জ্বালানির সংখ্যা আরও সীমিত হয়েছে।
জার্মান শিল্পখাতের প্রতিনিধিরা বলছেন, তাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিরবচ্ছিন্ন ও প্রতিযোগিতামূলক মূল্যের বিদ্যুৎ সরবরাহ।
শিল্প উদ্যোক্তাদের মতে, শুধু নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর নির্ভর করে এখনই শিল্পখাতের দীর্ঘমেয়াদি চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে হলে ভবিষ্যৎ জ্বালানি নীতিতে স্পষ্টতা প্রয়োজন।
দেশটির অন্যতম বৃহৎ লিগনাইট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান LEAG মনে করছে, জ্বালানি নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি ইতিবাচক। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর রুশ গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে তারা দ্রুত উৎপাদন বাড়িয়ে ঘাটতি মোকাবিলায় ভূমিকা রেখেছিল।
তাদের মতে, প্রয়োজন হলে ভবিষ্যতেও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর সক্ষমতা রয়েছে।
অন্যদিকে পরিবেশ গবেষক ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, কয়লার ব্যবহার দীর্ঘায়িত করা জ্বালানি রূপান্তরের লক্ষ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
তাদের মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা আরও বাড়ানো এবং বিদ্যুৎ সংরক্ষণ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগই হওয়া উচিত দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।
জার্মানির বর্তমান জোট সরকারে এ ইস্যুতে স্পষ্ট মতপার্থক্য দেখা যাচ্ছে। কেন্দ্র-ডানপন্থী সিডিইউ/সিএসইউ জোট তুলনামূলকভাবে কয়লার ব্যবহার কিছুটা দীর্ঘায়িত করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
অন্যদিকে, জোটসঙ্গী এসপিডি মনে করছে, কয়লার ব্যবহার বাড়ানো হলে তা পরিবেশবান্ধব জ্বালানি রূপান্তর প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করবে এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা দীর্ঘস্থায়ী করবে।
জার্মান সরকারকে চলতি বছরের মধ্যেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, ২০৩০ সালের লিগনাইট বিদায় পরিকল্পনা অপরিবর্তিত থাকবে নাকি জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য কিছু সক্ষমতা কৌশলগত রিজার্ভ হিসেবে সংরক্ষণ করা হবে।
আগস্টে প্রকাশিত হতে যাওয়া সরকারি পর্যালোচনা প্রতিবেদনে কয়লা বিদায় কর্মসূচির প্রভাব, বিদ্যুৎ সরবরাহের নিরাপত্তা এবং জ্বালানির মূল্য পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হবে। বিশ্লেষকদের ধারণা, যে পর্যালোচনা একসময় কয়লা বিদায় ত্বরান্বিত করার উদ্দেশ্যে শুরু হয়েছিল, সেটিই এখন পরিকল্পনা ধীরগতির করার যুক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
ফলে ইউরোপের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ জার্মানি আগামী দিনে কয়লা থেকে কত দ্রুত সরে আসবে, তা এখন জ্বালানি খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
