T TIME NEWS (6)
এল নিনোর তাণ্ডবে পাপুয়া নিউগিনিতে খাদ্য সংকটের শঙ্কা, ঝুঁকিতে ৩০ লাখ মানুষ

এল নিনোর তাণ্ডবে পাপুয়া নিউগিনিতে খাদ্য সংকটের শঙ্কা, ঝুঁকিতে ৩০ লাখ মানুষ

 

পাপুয়া নিউগিনির পার্বত্য অঞ্চলে এল নিনো আবহাওয়া প্রভাবের কারণে তীব্র খরা, অস্বাভাবিক তুষারপাত ও পানির সংকট দেখা দিয়েছে। এতে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কৃষিজমি ও খাদ্য উৎপাদন। মানবিক সহায়তা সংস্থা অক্সফামের আশঙ্কা, পরিস্থিতির অবনতি হলে দেশজুড়ে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ খাদ্য সংকট ও অপুষ্টির ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।

দেশটির হাইল্যান্ডস অঞ্চলে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম হচ্ছে। একই সঙ্গে তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে নেমে যাওয়ায় অনেক এলাকায় তুষারপাতের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ফলে আলু, শাকসবজি ও অন্যান্য প্রধান খাদ্যশস্যের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

ওয়েস্টার্ন হাইল্যান্ডস প্রদেশের তাম্বুল এলাকার কৃষক জন ওয়ানকার জানান, এক সকালে ঘুম থেকে উঠে তিনি দেখেন তার পুরো খাদ্যবাগান তুষারে ঢেকে গেছে। পরিবারের খাদ্য ও আয়ের প্রধান উৎস ছিল ওই বাগান। ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এখন ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন।

একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন চিম্বু প্রদেশের কুন্ডিয়াওয়া-গেমবগল এলাকার বাসিন্দা মার্থা জন। তিনি বলেন, তাদের আলুর খেত তুষারে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব ফসল শুধু পরিবারের খাদ্য নয়, বরং সন্তান ও নাতি-নাতনিদের জীবিকারও অন্যতম উৎস ছিল।

অক্সফাম পিএনজির তথ্য অনুযায়ী, প্রায় এক বছর ধরে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তুষারপাত ও বিভিন্ন ক্ষতিকর পোকামাকড়ের আক্রমণ। ফলে কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।

সংস্থাটি জানিয়েছে, হাইল্যান্ডস অঞ্চলের প্রায় ১৯ লাখ মানুষসহ সারা দেশে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাবের মুখে পড়তে পারেন। অনেক এলাকায় খাদ্য মজুত মাত্র দুই থেকে তিন মাসের জন্য যথেষ্ট থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

শুধু খাদ্য নয়, নিরাপদ পানির প্রাপ্যতাও কমে যাচ্ছে। বিভিন্ন নদী ও ঝরনার পানি শুকিয়ে যাওয়ায় স্থানীয় জনগণ বিকল্প উৎসের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন।

কিছু এলাকায় পানির অভাব ও অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে বিদ্যালয়ের কার্যক্রমও সীমিত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

পাপুয়া নিউগিনির জাতীয় আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, এল নিনো প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ধারা পরিবর্তন করে দেয়। এতে আর্দ্রতা কমে যায় এবং দীর্ঘ সময় খরা পরিস্থিতি বিরাজ করে।

মেঘের পরিমাণ কমে যাওয়ায় দিনের তাপ দ্রুত রাতে বেরিয়ে যায়। ফলে পার্বত্য এলাকায় তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে নেমে গিয়ে তুষারপাতের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, যা কৃষিজ ফসলের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ক মন্ত্রী বিলি জোসেফ জানিয়েছেন, বিভিন্ন অঞ্চলে পরিচালিত মূল্যায়নে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া, পানির উৎস সংকুচিত হওয়া এবং খাদ্যবাগানে আর্দ্রতার ঘাটতির বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী জেমস মারাপে সম্ভাব্য দীর্ঘস্থায়ী খরা মোকাবিলায় সব প্রদেশ ও জেলা প্রশাসনকে আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

তিনি বলেন, “এটি আতঙ্কিত হওয়ার সময় নয়, বরং প্রস্তুতি নেওয়ার সময়। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে পানি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।”

পাপুয়া নিউগিনির গ্রামীণ অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর। ফসল উৎপাদন কমে গেলে শুধু খাদ্য সংকটই নয়, হাজার হাজার পরিবারের আয়ও কমে যাবে।

জাতীয় কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক মূল্যায়নে দেখা গেছে, তাম্বুল এলাকার একজন কৃষক তুষারপাতে তার আলু উৎপাদনের অর্ধেক হারিয়েছেন। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ওই ফসল বিক্রি করে তিনি উল্লেখযোগ্য আয় করতে পারতেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত ত্রাণ সহায়তা, কৃষি পুনর্বাসন কর্মসূচি এবং নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত না করা গেলে আগামী মাসগুলোতে মানবিক সংকট আরও গভীর হতে পারে।

এল নিনোর প্রভাবে পাপুয়া নিউগিনিতে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা শুধু একটি আবহাওয়াজনিত সমস্যা নয়; এটি খাদ্য নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য এবং গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এল নিনোর প্রভাব আরও কয়েক মাস স্থায়ী হতে পারে। ফলে আগাম প্রস্তুতি ও আন্তর্জাতিক সহায়তা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।


 

 

 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *