T TIME NEWS (6)
মার্কিন যুদ্ধবিমান চালকের বিচার ব্রিটিশ আদালতে নয়, মার্কিন ঘাঁটিতে: প্রশ্নের মুখে ন্যায়বিচার

মার্কিন যুদ্ধবিমান চালকের বিচার ব্রিটিশ আদালতে নয়, মার্কিন ঘাঁটিতে: প্রশ্নের মুখে ন্যায়বিচার

যুক্তরাজ্যের এক বিশ্ববিদ্যালয় গবেষককে শ্বাসরোধ ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগে অভিযুক্ত মার্কিন যুদ্ধবিমান চালক ক্যাপ্টেন জ্যাকব উলফসনের বিচার ব্রিটিশ আদালতের পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আদালতে হওয়ায় ন্যায়বিচার ও বিচারিক সার্বভৌমত্ব নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ইংল্যান্ডের কেমব্রিজে সংঘটিত অভিযোগের ঘটনায় অভিযুক্তকে শ্বাসরোধের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হলেও যৌন নিপীড়নের অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়া হয়। পরে তাকে মাত্র ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

 

ঘটনার সূত্রপাত ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে। ব্রিটিশ শিক্ষাবিদ সারাহ স্টিলের অভিযোগ, অনলাইন পরিচয়ের পর প্রথমবার সাক্ষাৎ করতে গিয়ে তিনি মার্কিন বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা জ্যাকব উলফসনের বাসায় যান। সেখানে তাকে মাদক প্রয়োগ, শ্বাসরোধ এবং সম্মতি ছাড়া যৌন সম্পর্ক স্থাপনের শিকার হতে হয়।

স্টিলের ভাষ্য অনুযায়ী, পরদিন সকালে তিনি একটি বাথটাবে অচেতন অবস্থা থেকে জেগে ওঠেন। তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে ব্যথা ও আঘাতের চিহ্ন ছিল। পরে হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পাশাপাশি তিনি বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানান।

 

ঘটনাটি ইংল্যান্ডে এবং অভিযুক্তের দায়িত্ব পালনের সময়ের বাইরে ঘটলেও মামলাটি ব্রিটিশ ক্রাউন কোর্টে না গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আদালতে বিচার করা হয়। বিচার অনুষ্ঠিত হয় ইংল্যান্ডের সাফোকে অবস্থিত মার্কিন বিমানঘাঁটি আরএএফ লেকেনহিথে।

এই আদালতে বিচারক ছিলেন একজন মার্কিন বিমানবাহিনীর কর্নেল এবং জুরির দায়িত্ব পালন করেন একই ঘাঁটিতে কর্মরত আটজন সামরিক কর্মকর্তা। তাদের সবাই পুরুষ ছিলেন।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের ঘটনায় সাধারণত যুক্তরাজ্যের বিচারিক কর্তৃপক্ষের এখতিয়ার থাকার কথা। তবে বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে মার্কিন সামরিক সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত ও বিচার মার্কিন কর্তৃপক্ষের হাতেই চলে যায়।

 

বিচার চলাকালে প্রসিকিউশন দাবি করে, স্টিলের শরীরে নিষিদ্ধ ওষুধজাতীয় একটি উপাদানের উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছিল এবং অভিযুক্ত তার ওপর বলপ্রয়োগ করেছিলেন।

অন্যদিকে প্রতিরক্ষা আইনজীবীরা অভিযোগগুলোকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন। তারা অভিযোগকারীর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এবং তার বক্তব্যকে আর্থিক সুবিধা পাওয়ার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেন।

উলফসন বিচার চলাকালে অধিকাংশ সময় নীরব থাকেন। পরে সাজা ঘোষণার আগে দেওয়া বক্তব্যে তিনি স্বীকার করেন যে ওই রাতে তিনি অতিরিক্ত মদ্যপ অবস্থায় ছিলেন এবং পরিস্থিতি “সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল”।

 

দীর্ঘ শুনানি শেষে সামরিক জুরি উলফসনকে শ্বাসরোধের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে। পাশাপাশি ভুক্তভোগীর সঙ্গে যোগাযোগ না করার নির্দেশ অমান্যের অভিযোগেও তাকে দোষী ঘোষণা করা হয়।

তবে সম্মতি ছাড়া যৌন সম্পর্ক স্থাপনের অভিযোগে তাকে খালাস দেওয়া হয়।

সাজা নির্ধারণের সময় প্রসিকিউশন পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দাবি করলেও জুরি তাকে মাত্র ছয় মাসের কারাদণ্ড দেয়। পাশাপাশি তাকে বিমানবাহিনী থেকে বহিষ্কার এবং আনুষ্ঠানিক তিরস্কারের শাস্তি দেওয়া হয়।

 

রায়ের পর সারাহ স্টিল বিচারপ্রক্রিয়াকে “অপমানজনক” ও “মানসিকভাবে বিধ্বংসী” বলে বর্ণনা করেন।

তার অভিযোগ, পুরো বিচারব্যবস্থায় তাকে বারবার নিজের ব্যক্তিগত জীবন, চিকিৎসা ইতিহাস এবং ব্যক্তিগত বার্তার ব্যাখ্যা দিতে বাধ্য করা হয়েছে। এতে মনে হয়েছে যেন অভিযুক্ত নয়, তাকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে।

তিনি বলেন, “আমি স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলাম কোন সীমা অতিক্রম করা যাবে না। সেই সীমা উপেক্ষা করা হয়েছিল। এটি কোনো ভুল বোঝাবুঝি ছিল না, বরং আমার নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার প্রতি অবহেলা ছিল।”

 

আরএএফ লেকেনহিথ যুক্তরাজ্যে অবস্থিত বৃহত্তম মার্কিন বিমানঘাঁটিগুলোর একটি। এখানে হাজারো মার্কিন সামরিক সদস্য ও তাদের পরিবার বসবাস করেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশে অবস্থানরত মার্কিন সেনাসদস্যদের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগে বিচারিক এখতিয়ার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। সমালোচকদের দাবি, স্থানীয় আদালতের পরিবর্তে সামরিক আদালতে বিচার হলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে মার্কিন বিমানবাহিনী বলছে, তাদের সামরিক বিচারব্যবস্থায় কঠোর প্রক্রিয়া ও আইনি সুরক্ষা রয়েছে এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই তাদের অগ্রাধিকার।

 

উলফসনের মামলাটি এখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে মার্কিন বিমানবাহিনীর আপিল আদালতে পর্যালোচনার জন্য যাবে। আপিল আদালত চাইলে মামলার তথ্য-প্রমাণ পুনরায় মূল্যায়ন করতে পারবে।

সাজা শেষে উলফসনের যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

 

এই মামলা শুধু একটি অপরাধের বিচার নয়; বরং বিদেশি সামরিক সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রে বিচারিক কর্তৃত্ব, ভুক্তভোগীর অধিকার এবং আন্তর্জাতিক সামরিক উপস্থিতির আইনি প্রভাব নিয়ে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে। যুক্তরাজ্যের মাটিতে সংঘটিত একটি ঘটনার বিচার বিদেশি সামরিক কাঠামোর অধীনে হওয়ায় বিষয়টি ভবিষ্যতেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *