মাটি তরলীকরণের আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন বিশেষজ্ঞরা, ভবন নির্মাণে কঠোর বিধিমালা অনুসরণের তাগিদ
রাজধানী ঢাকার বিস্তীর্ণ অংশ একটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের সময় ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন ভূতত্ত্ববিদ ও প্রকৌশল বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, নগরীর অর্ধেকেরও বেশি এলাকা এমন মাটির ওপর গড়ে উঠেছে যেখানে ভূমিকম্পের কম্পনে মাটি তরল অবস্থার মতো আচরণ করতে পারে, ফলে ভবন, সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
সম্প্রতি রাজধানীর ভূমিকম্পজনিত ঝুঁকি নিয়ে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) আওতাধীন এলাকার প্রায় ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ অংশ উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ মাটি তরলীকরণ অঞ্চলের মধ্যে রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাভূমি ভরাট এবং দুর্বল মাটির ওপর ব্যাপক নির্মাণ কার্যক্রম ঢাকাকে আরও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
ভূমিকম্পের সময় পানিসমৃদ্ধ ঢিলা বালুমাটি তার দৃঢ়তা হারিয়ে তরলের মতো আচরণ করলে তাকে ‘সয়েল লিকুইফ্যাকশন’ বা মাটি তরলীকরণ বলা হয়। এ অবস্থায় ভবনের ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায়, মাটিতে ধস বা ফাটল দেখা দেয় এবং ভবন হেলে পড়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় অতীতে ভরাট করা জলাভূমি ও নিম্নাঞ্চল এই ঝুঁকির মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ও রাজউকের যৌথ গবেষণায় ঢাকার মাটির ঝুঁকিকে চারটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে লাল ও বেগুনি অঞ্চলকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
গবেষণায় দেখা যায়, সাভার, কেরানীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জের বিস্তীর্ণ এলাকা, বাড্ডা, ধানমন্ডির কিছু অংশ, মোহাম্মদপুর, নিউমার্কেট, লালবাগসহ রাজধানী ও পার্শ্ববর্তী এলাকার অনেক অঞ্চল উচ্চ ঝুঁকির আওতায় রয়েছে।
অন্যদিকে গুলশান, পল্লবী, খিলগাঁও, তেজগাঁও, রামপুরা, মতিঝিল, ডেমরাসহ বিভিন্ন এলাকা মাঝারি থেকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
ভূতত্ত্ববিদদের মতে, ঢাকার একটি বড় অংশ জলাভূমি, বন্যাপ্রবণ সমভূমি এবং পুরোনো নদীখাতের ওপর বিস্তৃত। এসব এলাকায় নরম পলিমাটি ও কৃত্রিমভাবে ভরাট করা মাটি বিদ্যমান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ বিজ্ঞান ও জলবায়ু সহনশীলতা বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. জিল্লুর রহমান বলেন, রাজধানীর মাত্র প্রায় ৩৫ শতাংশ এলাকা তুলনামূলক শক্তিশালী প্রাচীন লাল মাটির ওপর অবস্থিত। বাকি অংশের উল্লেখযোগ্য অংশই নরম ও ঝুঁকিপূর্ণ ভূমিতে গড়ে উঠেছে।
তার মতে, গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি, পুরান ঢাকা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, মিরপুর ও মতিঝিল তুলনামূলকভাবে ভালো মাটির ওপর অবস্থিত হলেও নদী ও জলাভূমি সংলগ্ন এলাকায় ভূমিকম্পের ঝুঁকি অনেক বেশি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিরাপদ ভবন নির্মাণ সম্ভব হলেও তার জন্য প্রয়োজন যথাযথ পাইলিং, মাটি উন্নয়ন এবং বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) কঠোরভাবে অনুসরণ করা।
তাদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে নির্মাণ ব্যয় কমানোর জন্য পর্যাপ্ত মাটি উন্নয়ন ছাড়া শুধু পাইলের ওপর নির্ভর করে ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে ভূমিকম্পের সময় ভবনের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
বুয়েটের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারীর মতে, ভরাটকৃত জমিতে নির্মাণের আগে ওপরের কয়েক মিটার মাটির গুণগত মান উন্নয়ন করলে ভূমিকম্পজনিত ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
নগর পরিকল্পনাবিদরা জানান, ঢাকার নরম মাটির ঝুঁকি নিয়ে একটি বিশেষ মানচিত্র প্রস্তুত করা হলেও তা এখনও রাজধানীর উন্নয়ন পরিকল্পনায় পূর্ণাঙ্গভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
রাজউকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (ডিএপি) হালনাগাদের সময় এসব তথ্য সংযোজনের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
রিয়েল এস্টেট খাতের প্রতিনিধিরা দাবি করেছেন, বর্তমানে অধিকাংশ অনুমোদিত নির্মাণ প্রকল্পে জাতীয় বিল্ডিং কোড অনুসরণ করা হচ্ছে এবং ভূমিকম্প সহনশীল নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছে।
তবে তারাও স্বীকার করছেন, রিখটার স্কেলে ৭ বা তার বেশি মাত্রার বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে রাজধানীর প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা আগাম নির্ধারণ করা কঠিন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমিকম্প ঠেকানো সম্ভব নয়, কিন্তু ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমানো সম্ভব। এজন্য নগর পরিকল্পনা, মাটির বৈশিষ্ট্যভিত্তিক ভবন নকশা, জলাভূমি সংরক্ষণ এবং নির্মাণ বিধিমালার কঠোর বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প ঢাকার জন্য ভয়াবহ মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
