নবীনদের ‘শৃঙ্খলা শিক্ষা’র নামে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ, তদন্তের পর প্রশাসনের ব্যবস্থা
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের নবীন শিক্ষার্থীদের র্যাগিং করার অভিযোগে একই বিভাগের ৫৪তম ব্যাচের ১২ শিক্ষার্থীকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। নবীনদের ‘ম্যানার শেখানো’ বা শৃঙ্খলা শিক্ষা দেওয়ার নামে শারীরিক ও মানসিকভাবে হেনস্তার অভিযোগের পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জারি করা এক অফিস আদেশে জানানো হয়, অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের শৃঙ্খলা-সংক্রান্ত বিধিমালা অনুযায়ী তাদের সাময়িক বহিষ্কার কার্যকর করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত ৩ জুলাই রাত থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ইতিহাস বিভাগের ৫৫তম ব্যাচের কয়েকজন নবীন শিক্ষার্থীকে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পরিচিতি পর্ব ও আচরণবিধি শেখানোর কথা বলে তাদের ওপর নানা ধরনের চাপ প্রয়োগ করা হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, নবীনদের দীর্ঘ সময় দাঁড় করিয়ে রাখা, অশোভন ভাষায় কথা বলা, অপমানজনক মন্তব্য করা এবং বিভিন্ন নির্দেশ মানতে বাধ্য করার মতো ঘটনা ঘটে। এতে কয়েকজন শিক্ষার্থী মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনার একপর্যায়ে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের একজন বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের জানালে তাৎক্ষণিকভাবে প্রক্টরিয়াল টিম ও অ্যান্টি-র্যাগিং কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান।
পরে অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা কার্যালয়ে নেওয়া হয়। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর ক্যাম্পাসে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয় এবং র্যাগিংবিরোধী অবস্থান আরও জোরালো করার দাবি ওঠে।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা পরবর্তীতে প্রক্টর বরাবর লিখিত অভিযোগ জমা দেন। অভিযোগে তারা জানান, র্যাগিং চলাকালে তাদের ব্যক্তিগত মর্যাদাহানিকর আচরণের শিকার হতে হয়েছে এবং পরিবারের সদস্যদের নিয়েও আপত্তিকর মন্তব্য করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত শিক্ষার্থীরাও লিখিতভাবে ঘটনার দায় স্বীকার করেছেন। তাদের বক্তব্যে নবীন শিক্ষার্থীদের একটি দলকে ‘শৃঙ্খলা শেখানোর’ উদ্দেশ্যে কার্যক্রম পরিচালনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, শিক্ষাঙ্গনে র্যাগিংয়ের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ও সহায়ক শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
প্রশাসনের মতে, নতুন শিক্ষার্থীদের স্বাগত জানানোর নামে কোনো ধরনের মানসিক চাপ, অপমান বা নির্যাতন বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালার পরিপন্থী এবং এমন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে।
উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে র্যাগিং দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত একটি সমস্যা। শিক্ষাবিদরা মনে করেন, র্যাগিং শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য, আত্মবিশ্বাস এবং শিক্ষাজীবনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সচেতনতা বৃদ্ধি, কঠোর নজরদারি এবং কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঘটনায় আবারও শিক্ষাঙ্গনে র্যাগিং সংস্কৃতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও ভয়মুক্ত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে।
