রেমিট্যান্স ও সেবা খাতের শক্তিশালী ভূমিকা; ২০২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি আরও ত্বরান্বিত হওয়ার পূর্বাভাস
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং অভ্যন্তরীণ নানা চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও বাংলাদেশের অর্থনীতি উল্লেখযোগ্য স্থিতিস্থাপকতা প্রদর্শন করছে বলে জানিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। সংস্থাটির মতে, প্রবাসী আয় প্রবাহের ধারাবাহিক বৃদ্ধি এবং সেবা খাতের ইতিবাচক কার্যক্রম দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
এডিবির সর্বশেষ এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক (এডিও) জুলাই ২০২৬ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে। তবে অর্থনৈতিক সংস্কার অব্যাহত থাকলে ২০২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কঠোর আর্থিক নীতি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও দেশে বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহে ইতিবাচক ধারা বজায় রয়েছে। বিশেষ করে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স অর্থনীতির অন্যতম প্রধান সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করছে।
এছাড়া পরিবহন, যোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি, বাণিজ্য ও অন্যান্য সেবাভিত্তিক খাতের সম্প্রসারণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সচল রাখতে সহায়তা করছে।
এডিবির বাংলাদেশ আবাসিক মিশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান আকিরা মাতসুনাগা বলেছেন, বৈশ্বিক ও স্থানীয় অর্থনৈতিক চাপ সত্ত্বেও বাংলাদেশ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। তবে এই ধারা টেকসই করতে সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
তার মতে, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, আর্থিক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা, জ্বালানি ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করা এবং ব্যবসা পরিচালনার প্রক্রিয়া সহজ করা হলে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার আরও দ্রুত হবে।
প্রতিবেদনে মূল্যস্ফীতি নিয়েও বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে। এডিবি মনে করছে, ২০২৬ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি থাকতে পারে।
তবে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি হলে ২০২৭ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমে ৮ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা গেলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে এবং অভ্যন্তরীণ ভোগব্যয়ও ইতিবাচক প্রভাব পাবে।
এডিবি বলছে, ব্যবসা পরিচালনার বিধি-বিধান সহজীকরণ, কর প্রশাসনের আধুনিকীকরণ, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং রেমিট্যান্সে প্রণোদনা অব্যাহত থাকলে বেসরকারি বিনিয়োগে নতুন গতি আসবে।
এর ফলে শিল্প ও সেবা খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে এবং অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব হবে।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি মূল্য, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিস্থিতি এবং ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার মতো বিষয়গুলো বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ কারণে অর্থনীতিকে বহিরাগত ধাক্কা থেকে সুরক্ষিত রাখতে নীতিগত ধারাবাহিকতা ও বিচক্ষণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে এডিবি।
এডিবির মূল্যায়ন অনুযায়ী, প্রবৃদ্ধির গতি কিছুটা কমলেও বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো স্থিতিশীল ও সহনশীল অবস্থানে রয়েছে। শক্তিশালী রেমিট্যান্স, সেবা খাতের সম্প্রসারণ এবং চলমান সংস্কার কার্যক্রম দেশের অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের পথে এগিয়ে নিচ্ছে। প্রয়োজনীয় নীতি সংস্কার অব্যাহত থাকলে আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশ আরও শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথে অগ্রসর হতে পারে।
