গবেষকদের পরামর্শ: চোখ, কান ও মস্তিষ্কের ছোট কৌশলেই কমতে পারে অস্বাস্থ্যকর খাবারের প্রতি আকর্ষণ
মানুষ সাধারণত মনে করে খাবার নির্বাচন সম্পূর্ণ তার নিজের সিদ্ধান্ত। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, বাস্তবে আমাদের চোখ, কান, নাক ও স্পর্শের অনুভূতি প্রতিনিয়ত খাদ্যাভ্যাসকে প্রভাবিত করছে। খাবারের রং, প্যাকেটের নকশা, পরিবেশনের ধরন, এমনকি পেছনে বাজতে থাকা সংগীতও নির্ধারণ করতে পারে আমরা কী খাব এবং কতটা খাব।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইন্দ্রিয়গত এই প্রভাবগুলোকে সচেতনভাবে কাজে লাগানো গেলে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা অনেক সহজ হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছোট ছোট কিছু পরিবর্তনের মাধ্যমে মানুষ নিজের অজান্তেই তুলনামূলক ভালো খাদ্য নির্বাচন করতে পারে।
খাদ্যপণ্যের মোড়ক আমাদের সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখে। উজ্জ্বল রং, চকচকে প্যাকেট কিংবা আকর্ষণীয় ব্র্যান্ডিং খাবারকে আরও লোভনীয় করে তোলে।
গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব খাবার দৃশ্যত বেশি আকর্ষণীয়, মানুষ সেগুলোর প্রতি দ্রুত আগ্রহ দেখায়। বিশেষ করে লাল, হলুদ বা বেগুনি রঙের প্যাকেজিং অনেক সময় ভোক্তাকে বেশি ক্যালোরিযুক্ত বা মিষ্টি খাবারের দিকে টেনে নেয়।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, বিস্কুট, চকলেট বা অন্যান্য স্ন্যাকস বাড়িতে রাখলেও সেগুলো স্বচ্ছ পাত্রে না রেখে ঢাকনাযুক্ত বা অস্বচ্ছ জারে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। এতে অপ্রয়োজনীয় খাবার খাওয়ার প্রবণতা কমতে পারে।
খাবারের অবস্থানও কেনাকাটার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। সাধারণত মানুষ চোখের সমতলে থাকা পণ্য সহজে বেছে নেয়।
খুচরা বিক্রেতারা প্রায়ই বেশি লাভজনক বা আকর্ষণীয় পণ্য চোখের সমতলে রাখে এবং চেকআউট কাউন্টারের পাশে বিভিন্ন স্ন্যাকস সাজিয়ে রাখে যাতে ক্রেতারা হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে কিনে ফেলেন।
তাই স্বাস্থ্যকর বিকল্প খুঁজতে হলে তাকের ওপরের বা নিচের সারিতেও নজর দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন গবেষকরা।
খাবার পরিবেশনের পাত্রও খাওয়ার অভিজ্ঞতায় প্রভাব ফেলে।
কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, ভারী বাটি বা প্লেটে পরিবেশিত খাবার মানুষ তুলনামূলক বেশি তৃপ্তিদায়ক মনে করে। একইভাবে ভারী কাটলারি ব্যবহারে খাবারের স্বাদ ও সন্তুষ্টির অনুভূতিও বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে অতিরিক্ত খাবার গ্রহণের প্রবণতা কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
খাবারের উপস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, নান্দনিকভাবে সাজানো সালাদ একই উপকরণ দিয়ে তৈরি সাধারণ সালাদের তুলনায় বেশি সুস্বাদু মনে হয়েছে অংশগ্রহণকারীদের কাছে।
বিভিন্ন রঙের শাকসবজি, ফল ও স্বাস্থ্যকর উপাদান দিয়ে প্লেট সাজালে খাবারের প্রতি আগ্রহ বাড়ে এবং স্বাস্থ্যকর খাবারও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
খাওয়ার সময় পরিবেশের শব্দ ও সংগীতও আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ধীর লয়ের সংগীত মানুষকে ধীরে ধীরে খাবার খেতে উৎসাহিত করে। ধীরে খেলে সাধারণত কম ক্যালোরি গ্রহণ করা হয় এবং তৃপ্তির অনুভূতি দ্রুত আসে।
অন্যদিকে টেলিভিশন, মোবাইল ফোন বা অন্যান্য বিভ্রান্তিকর উপাদান খাওয়ার সময় অতিরিক্ত খাবার গ্রহণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
পুষ্টিবিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষ সাধারণত খাবারের পরিমাণ দেখে তৃপ্তি অনুভব করে; ক্যালোরির হিসাব সবসময় মাথায় থাকে না।
তাই একই পরিমাণ খাবারে ক্যালোরি কমাতে চাইলে শাকসবজি, ফল ও আঁশযুক্ত উপাদান বাড়ানো যেতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, খাবারে ফুলকপি, পালং শাক বা অন্যান্য সবজি যোগ করে ক্যালোরি কমানো হলেও মানুষ সমান তৃপ্তি অনুভব করেছে।
অনেকেই মূল খাবার শেষ করে তৃপ্ত বোধ করলেও মিষ্টান্ন দেখলে আবার খেতে ইচ্ছা করে। বিজ্ঞানীরা একে ‘ডেজার্ট স্টমাক’ প্রভাব বলে থাকেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু কোনো আকর্ষণীয় ডেজার্ট দেখাও অতিরিক্ত খাওয়ার ইচ্ছা তৈরি করতে পারে, যদিও শরীরের প্রকৃত ক্ষুধা না থাকে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্ষুধা ও আকর্ষণের পার্থক্য বুঝতে পারলে অতিরিক্ত ক্যালোরি গ্রহণ কমানো সম্ভব।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্যবিজ্ঞান গবেষক চার্লস স্পেন্সের মতে, স্বাদ শুধু জিহ্বার অনুভূতি নয়; এটি মূলত বহু ইন্দ্রিয়ের সমন্বয়ে তৈরি একটি অভিজ্ঞতা।
অন্যদিকে নেদারল্যান্ডসের ভোক্তা আচরণ বিশেষজ্ঞ বেটিনা পিকেরাস-ফিজম্যান বলেন, খাবারের রং, প্যাকেজিং ও উপস্থাপন মানুষের প্রত্যাশা এবং খাদ্য নির্বাচনে বড় ভূমিকা রাখে।
স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে সবসময় কঠোর ডায়েট বা জটিল নিয়মের প্রয়োজন হয় না। গবেষণা বলছে, দৈনন্দিন জীবনের ছোট কিছু পরিবর্তন—যেমন খাবারের উপস্থাপনা, পাত্রের নির্বাচন, বাজার করার কৌশল কিংবা খাওয়ার সময়ের পরিবেশ—খাদ্যাভ্যাসে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। অর্থাৎ সুস্থভাবে খাওয়ার লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হতে পারে আমাদের নিজের ইন্দ্রিয়ই।
