উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের নিম্নাঞ্চলে সতর্কতা জোরদারের আহ্বান
সক্রিয় মৌসুমি বায়ু এবং সীমান্তবর্তী উজান এলাকায় ভারী বৃষ্টিপাতের প্রভাবে দেশের কয়েকটি অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের পাঁচটি নদীর নয়টি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে পানি বর্তমানে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় বন্যা ঝুঁকি আরও বেড়েছে।
শুক্রবার (১০ জুলাই) সকাল ৯টা পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে কেন্দ্র জানিয়েছে, সাঙ্গু, মাতামুহুরী, কুশিয়ারা, মনু এবং খোয়াই নদীর একাধিক পয়েন্টে পানির উচ্চতা বিপৎসীমা ছাড়িয়ে গেছে। এতে নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বান্দরবানে সাঙ্গু নদীর পানি বিপৎসীমার চেয়ে প্রায় ৯৫ সেন্টিমিটার এবং দোহাজারী পয়েন্টে ২৩ সেন্টিমিটার ওপরে রয়েছে। একইভাবে মাতামুহুরী নদীর লামা ও চিরিঙ্গা পয়েন্টে পানি যথাক্রমে ৪৭ ও ৩২ সেন্টিমিটার বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে।
সিলেট অঞ্চলে কুশিয়ারা নদীর মারকুলি ও ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে পানি যথাক্রমে ১৮ ও ১০ সেন্টিমিটার ওপরে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া মনু নদীর মনু রেলওয়ে ব্রিজ ও মৌলভীবাজার পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার চেয়ে ৩৫ ও ৮০ সেন্টিমিটার বেশি রয়েছে। খোয়াই নদীর বল্লা পয়েন্টেও পানি ৬০ সেন্টিমিটার ওপরে অবস্থান করছে।
বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র জানিয়েছে, তিস্তা, কুশিয়ারা, সুরমা, সোমেশ্বরী ও ছোট ফেনী নদীর আরও নয়টি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র সতর্কসীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে। এসব নদীর পানি আরও বৃদ্ধি পেলে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সতর্কসীমায় থাকা গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোর মধ্যে রয়েছে নীলফামারীর ডালিয়া, লালমনিরহাটের কাউনিয়া, গাইবান্ধার তারাপুর, মৌলভীবাজারের শেরপুর, সিলেটের কানাইঘাট, ছাতক ও সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনার কলমাকান্দা এবং নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের অভ্যন্তরে ভারী বৃষ্টির পাশাপাশি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অব্যাহত বর্ষণ নদীগুলোর পানি দ্রুত বাড়িয়ে দিচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ভারতের মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জিতে সর্বোচ্চ ১০৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
একই সময়ে বাংলাদেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২০৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে চট্টগ্রামে। এই অতিবৃষ্টি পার্বত্য ও উপকূলীয় অঞ্চলের নদীগুলোর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের পর্যবেক্ষণে থাকা ১২৭টি স্টেশনের মধ্যে ৭৯টিতে পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিপরীতে ৪৩টি স্টেশনে পানি কমেছে এবং পাঁচটি স্টেশনে পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে।
এ অবস্থায় নদী তীরবর্তী ও নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা অনুসরণ এবং সম্ভাব্য জরুরি পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বানও জানানো হয়েছে।
এদিকে কয়েক দিনের বৃষ্টিপাত ও নিম্নচাপের প্রভাবে রাজধানী ঢাকার বায়ুমানেরও উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণ সংস্থা আইকিউএয়ারের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার সকাল সাড়ে ৮টায় ঢাকার এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (AQI) স্কোর ছিল ৫৬, যা ‘মাঝারি’ বা সহনীয় পর্যায়ে বিবেচিত হয়।
দীর্ঘ সময় বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকার শীর্ষ দিকে অবস্থান করার পর এবার ঢাকার অবস্থান নেমে এসেছে বৈশ্বিক তালিকার ৫০তম স্থানে। বিশেষজ্ঞদের মতে, টানা বৃষ্টিপাত বাতাসের ভাসমান দূষিত কণাগুলো ধুয়ে দেওয়ায় এই উন্নতি দেখা গেছে।
আইকিউএয়ারের সর্বশেষ তালিকায় গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গোর রাজধানী কিনশাসা ১৮৪ স্কোর নিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহর হিসেবে অবস্থান করছে। এরপর রয়েছে ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা ও উগান্ডার কাম্পালা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার বর্তমান বায়ুমানের উন্নতি সাময়িক হলেও এটি প্রমাণ করে যে আবহাওয়ার পরিবর্তন বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য যানবাহনের নির্গমন, নির্মাণকাজের ধুলাবালি এবং শিল্পকারখানার দূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
একদিকে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা ঝুঁকি বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে বৃষ্টিপাত রাজধানীর বায়ুমানে সাময়িক স্বস্তি এনে দিয়েছে। আবহাওয়ার এই দ্বৈত প্রভাবের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বিশেষ করে বন্যাপ্রবণ এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পাশাপাশি দুর্যোগ প্রস্তুতি জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
