যুদ্ধক্ষেত্রের সমীকরণ বদলে দিচ্ছে বেইজিংয়ের ভূমিকা; আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দুর্বল হচ্ছে গণতন্ত্রপন্থী শিবির
মিয়ানমারের দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধে নতুন মোড় দেখা যাচ্ছে। কয়েক বছর ধরে সামরিক জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করা বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো এখন ক্রমেই চাপের মুখে পড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, চীনের সক্রিয় কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ, গুরুত্বপূর্ণ বিদ্রোহী সংগঠনগুলোর সঙ্গে যুদ্ধবিরতি এবং জান্তা প্রশাসনের প্রতি বেইজিংয়ের প্রকাশ্য সমর্থন দেশটির সংঘাতের ভারসাম্য বদলে দিচ্ছে। ফলে সামরিক বাহিনী আবারও কৌশলগত সুবিধা অর্জন করছে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে।
২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে অপসারণের পর থেকে মিয়ানমার রক্তক্ষয়ী সংঘাতে নিমজ্জিত। সংঘাত পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত এ লড়াইয়ে এক লাখেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
মিয়ানমারের সাগাইং অঞ্চলের একটি গোপন প্রশিক্ষণ শিবিরে অবস্থানরত গণতন্ত্রপন্থী পিপলস ডিফেন্স ফোর্স (পিডিএফ)-এর এক কমান্ডার জানান, আন্দোলনের প্রাথমিক উচ্ছ্বাস এখন অনেকটাই কমে গেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের কারণে যোদ্ধাদের মধ্যে ক্লান্তি, অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় বাড়ছে।
একসময় বিদ্রোহী জোট সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সাফল্য অর্জন করেছিল। বিশেষ করে ২০২৩ সালে বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনের সঙ্গে সমন্বিত অভিযানে তারা দেশের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে অগ্রগতি অর্জন করে এবং মান্দালয়ের উপকণ্ঠ পর্যন্ত প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটেছে। অভিজ্ঞ ও শক্তিশালী কয়েকটি জাতিগত গোষ্ঠীর সমর্থন হারিয়ে পিডিএফ এখন আগের তুলনায় দুর্বল অবস্থানে রয়েছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে সবচেয়ে বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে চীন। বেইজিং মধ্যস্থতা করে কয়েকটি শক্তিশালী জাতিগত বিদ্রোহী সংগঠন ও জান্তা সরকারের মধ্যে যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করেছে। এর ফলে সংঘাতের কেন্দ্রীয় অঞ্চলে সামরিক বাহিনীর ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
বিশেষ করে মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স আর্মি (এমএনডিএএ) এবং তাং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি (টিএনএলএ)-এর মতো সংগঠনগুলোর সঙ্গে যুদ্ধবিরতি জান্তার জন্য বড় কূটনৈতিক ও সামরিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, সীমান্ত অঞ্চলের স্থিতিশীলতা এবং বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষার জন্যই চীন এ ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। একই সঙ্গে বেইজিং বর্তমানে মিয়ানমারের নতুন প্রশাসনিক কাঠামোকেও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পথে এগিয়ে নিতে সহায়তা করছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মিয়ানমারের সামরিক নেতৃত্ব আন্তর্জাতিক যোগাযোগও বাড়িয়েছে। জান্তা নেতা মিন অং হ্লাইং বিভিন্ন আঞ্চলিক সফরে অংশ নিয়েছেন এবং একাধিক দেশের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেছেন।
অন্যদিকে নির্বাসিত ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট (এনইউজি) স্বীকার করেছে যে জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনগুলোর সমর্থন কমে যাওয়া তাদের জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক ও সামরিক ধাক্কা।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একটি অংশ দীর্ঘদিনের অচলাবস্থার অবসান চায়। ফলে তারা মিয়ানমারের বর্তমান প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর পথ খুঁজছে, যদিও দেশটির রাজনৈতিক বৈধতা নিয়ে বিতর্ক এখনও অব্যাহত রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। পাশাপাশি থাইল্যান্ড ও চীনের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ পুনরায় সচল হওয়ায় অর্থনৈতিক সুবিধাও পাচ্ছে তারা।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, শক্তিশালী জাতিগত মিত্রদের সহযোগিতা ছাড়া পিডিএফের মতো সংগঠনগুলোর পক্ষে দীর্ঘমেয়াদে সামরিক চাপ বজায় রাখা কঠিন হবে। অস্ত্র, প্রশিক্ষণ ও লজিস্টিক সহায়তার সীমাবদ্ধতাও তাদের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের পরিবর্তিত চিত্র শুধু দেশটির রাজনীতিতেই নয়, পুরো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী রাখাইন অঞ্চলের পরিস্থিতি রোহিঙ্গা সংকট, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
বিশ্লেষকদের মতে, জান্তা সরকার যদি আরও শক্তিশালী অবস্থানে ফিরে আসে, তবে সীমান্ত পরিস্থিতি এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতেও নতুন বাস্তবতা তৈরি হতে পারে।
পাঁচ বছরের সংঘাতে মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ এখন নতুন এক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। একসময় শক্তিশালী অবস্থানে থাকা বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো রাজনৈতিক ও সামরিক উভয় ক্ষেত্রেই চাপে রয়েছে। অন্যদিকে চীনের সমর্থন, কূটনৈতিক তৎপরতা এবং যুদ্ধবিরতির কৌশল কাজে লাগিয়ে জান্তা সরকার ধীরে ধীরে নিজেদের অবস্থান পুনর্গঠন করছে। তবে সংঘাতের চূড়ান্ত পরিণতি এখনও অনিশ্চিত, কারণ দেশটির রাজনৈতিক সংকটের স্থায়ী সমাধান এখনো দৃষ্টিগোচর হয়নি।
