রংপুরে ১১-দলীয় ঐক্যের সমাবেশে সীমান্ত হত্যা, গণভোট ও আঞ্চলিক বৈষম্য নিয়ে সরব রাজনৈতিক নেতারা
সীমান্ত পরিস্থিতি, তিস্তা মহাপরিকল্পনা, গণভোট বাস্তবায়ন এবং আঞ্চলিক বৈষম্যের প্রশ্নে সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। তিনি অভিযোগ করেন, সীমান্তে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হলেও সরকার কার্যকর অবস্থান নিচ্ছে না। একই সঙ্গে তিস্তা মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, জনগণের প্রত্যাশার বিরুদ্ধে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত হবে না।
শনিবার (১১ জুলাই) বিকেলে রংপুর জিলা স্কুল মাঠে আয়োজিত ১১-দলীয় ঐক্যের বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, সীমান্ত হত্যা ও পুশ-ইন বন্ধ, গণভোটের রায় কার্যকর এবং উত্তরাঞ্চলের জনদুর্ভোগ নিরসনের দাবিতে এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
সমাবেশে শফিকুর রহমান বলেন, সীমান্ত এলাকায় প্রতিবেশী দেশের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে জনমনে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাঁর দাবি, সীমান্ত রক্ষায় দায়িত্বপ্রাপ্ত বাহিনীর পাশাপাশি স্থানীয় জনগণও সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। এ ক্ষেত্রে সীমান্ত অঞ্চলের বাসিন্দাদের ভূমিকার প্রশংসা করেন তিনি।
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও বাস্তব চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অন্যথায় রাজনৈতিকভাবে নেতিবাচক পরিণতি তৈরি হতে পারে।
তিস্তা অববাহিকার দীর্ঘদিনের সমস্যা তুলে ধরে জামায়াতের আমির বলেন, উত্তরাঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও নদীকেন্দ্রিক সংকট নিরসনে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। তিনি দাবি করেন, এ প্রকল্প নিয়ে আর বিলম্ব না করে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে।
গণভোট প্রসঙ্গেও তিনি বলেন, জনগণের কাছে দেওয়া রাজনৈতিক অঙ্গীকার থেকে তাঁদের দল সরে আসবে না এবং এ বিষয়ে আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
সমাবেশে সভাপতির বক্তব্য দেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার সম্ভাব্য দেশে ফেরা নিয়ে মন্তব্য করেন এবং বলেন, এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, দেশের বাইরে অবস্থান করেও শেখ হাসিনা দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন। তাঁর মতে, এ বিষয়ে সরকারের কূটনৈতিক অবস্থান আরও দৃশ্যমান হওয়া দরকার।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরের প্রসঙ্গ টেনে নাহিদ ইসলাম বলেন, তিস্তা প্রকল্প কিংবা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতে প্রত্যাশিত অগ্রগতি দেখা যায়নি। তিনি মনে করেন, জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় না হলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের দরকষাকষির সক্ষমতা দুর্বল হতে পারে।
রংপুর বিভাগের উন্নয়ন প্রসঙ্গেও সমাবেশে আলোচনা হয়। নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, জাতীয় বাজেটে উত্তরাঞ্চলের প্রতি যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। তাঁর দাবি, রাজনৈতিক বিবেচনায় উন্নয়ন বরাদ্দ বণ্টনের কারণে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব থাকা এলাকাগুলো কাঙ্ক্ষিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, জনগণের অধিকার ও উন্নয়ন নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও উন্নয়ন বরাদ্দে বৈষম্য গ্রহণযোগ্য নয়।
সমাবেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা বক্তব্য দেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন এলডিপির সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালাল উদ্দিন, এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামানসহ ১১-দলীয় ঐক্যের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা।
রংপুরের এই সমাবেশে সীমান্ত নিরাপত্তা, তিস্তা মহাপরিকল্পনা, গণভোট এবং আঞ্চলিক বৈষম্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুগুলো সামনে আসে। রাজনৈতিক নেতারা সরকারের বিভিন্ন নীতির সমালোচনা করলেও উন্নয়ন, সীমান্ত সুরক্ষা এবং জনগণের অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্নে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান। উত্তরাঞ্চলের দীর্ঘদিনের দাবিগুলো আগামী দিনে জাতীয় রাজনীতিতে আরও গুরুত্ব পাবে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
