চীনের রপ্তানিতে বড় পতনের সুযোগে শক্ত অবস্থান; নতুন বাজার সম্প্রসারণের সম্ভাবনা দেখছেন উদ্যোক্তারা
যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি বাজারে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নতুন অবস্থান তৈরি করেছে বাংলাদেশ। চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য উত্তেজনা এবং শুল্কসংক্রান্ত চাপের ফলে মার্কিন বাজারে চীনের পোশাক রপ্তানি বড় ধরনের সংকোচনের মুখে পড়েছে। এই পরিস্থিতির সুযোগে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে বড় পোশাক আমদানিকারক দেশটির বাজারে দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক সরবরাহকারীর অবস্থান অর্জন করেছে।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি কিছুটা কমলেও চীনের তুলনায় পতনের হার অনেক কম থাকায় বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে। ফলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে দেশের রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে দীর্ঘদিন ধরে শীর্ষস্থানীয় সরবরাহকারী ছিল চীন। তবে দুই দেশের মধ্যে চলমান বাণিজ্যিক দ্বন্দ্ব ও অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের কারণে মার্কিন আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো বিকল্প উৎস খুঁজতে শুরু করেছে।
এই পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশ লাভবান হলেও সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাওয়া দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, ক্রেতাদের সরবরাহ বৈচিত্র্যকরণের কৌশল বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সুযোগ তৈরি করছে।
সংশ্লিষ্ট পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ দশমিক ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আগের বছরের একই সময়ে এই আয় ছিল প্রায় ৩ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার।
অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে রপ্তানি আয়ে প্রায় ৮ শতাংশের কিছু বেশি হ্রাস পেয়েছে। একই সময়ে রপ্তানিকৃত পোশাকের পরিমাণও কমেছে। তবে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের রপ্তানি প্রায় ৪৩ শতাংশ কমে যাওয়ায় বাজার অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এগিয়ে গেছে।
বিশেষ করে মে মাসে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স ইতিবাচক ছিল। ওই মাসে দেশটি ৫৮২ মিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে।
পোশাক খাত সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত সুবিধা এনে দিয়েছে। তবে এই সুযোগ ধরে রাখতে হলে উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, পণ্যের বৈচিত্র্য এবং দ্রুত সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, বৈশ্বিক ক্রেতাদের আস্থা আরও বাড়াতে হলে মান নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন এবং শ্রমমান উন্নয়নের দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের বড় অংশ আসে তৈরি পোশাক শিল্প থেকে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাজারে অবস্থান শক্তিশালী হওয়া দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, কর্মসংস্থান এবং শিল্প বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তিত পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ যদি উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদন এবং নতুন ক্রেতা আকর্ষণে সফল হয়, তাহলে আগামী কয়েক বছরে রপ্তানি খাতে নতুন প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হবে।
চীনের রপ্তানিতে বড় ধরনের পতনের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক বাজারে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সরবরাহকারী হিসেবে উঠে আসা দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তবে এই অর্জনকে দীর্ঘস্থায়ী করতে উৎপাদন দক্ষতা, পণ্যের বৈচিত্র্য ও আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার বিকল্প নেই।
