বর্ষা মৌসুমে ঝুঁকি মোকাবিলায় জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বাড়ানো হয়েছে চিকিৎসা প্রস্তুতি
বর্ষা ও বন্যা মৌসুমে সাপের উপদ্রব বৃদ্ধি পাওয়ায় সাপে কাটা রোগীদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে দেশের সব জেলা হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম সরবরাহ করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এখন সাপের ছোবলের শিকার কোনো রোগী উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালে গেলেই প্রয়োজনীয় অ্যান্টিভেনম চিকিৎসা পেতে পারবেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, সাপের কামড়ে মৃত্যুহার কমানো এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য করার লক্ষ্যে আগাম প্রস্তুতির অংশ হিসেবে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে চিকিৎসকদের বিশেষ প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে, যাতে তারা আন্তর্জাতিক চিকিৎসা নির্দেশিকা অনুসরণ করে রোগীদের দ্রুত সেবা দিতে পারেন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষাকালে অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও বন্যার কারণে সাপের স্বাভাবিক আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে সাপ লোকালয়, কৃষিজমি এবং বসতবাড়ির আশপাশে চলে আসে। এ সময় সাপের কামড়ের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার কর্মকর্তারা জানান, বর্ষা শুরু হওয়ার আগেই দেশের বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রয়োজনীয় অ্যান্টিভেনম পাঠানো হয়েছে। এর ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের রোগীরাও স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
দেশের বিভিন্ন জেলার স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উপজেলা ও জেলা হাসপাতালগুলোতে অ্যান্টিভেনমের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা বলেন, শুধু ওষুধ সরবরাহ নয়, সাপে কাটা রোগীর জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা, বিষক্রিয়া শনাক্তকরণ এবং জীবনরক্ষাকারী পদক্ষেপ সম্পর্কে চিকিৎসকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
তারা সতর্ক করে বলেন, সাপে কামড়ানোর পর ওঝা, কবিরাজ বা ঝাড়ফুঁকের ওপর নির্ভর না করে দ্রুত নিকটস্থ সরকারি হাসপাতালে নেওয়াই রোগীর জীবন বাঁচানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে প্রতি বছর প্রায় ৪ লাখের বেশি মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হন। তাদের মধ্যে কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে। আক্রান্তদের অধিকাংশই গ্রামীণ এলাকার বাসিন্দা এবং কৃষিকাজ বা বাইরে কর্মরত মানুষেরা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, সাপের কামড়ের উল্লেখযোগ্য অংশ বিষাক্ত সাপের কারণে ঘটে, যা অনেক ক্ষেত্রে স্থায়ী শারীরিক জটিলতা বা অক্ষমতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সময়মতো অ্যান্টিভেনম প্রয়োগ করা গেলে অধিকাংশ বিষাক্ত সাপের দংশনের ক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে লাখো মানুষ সাপের ছোবলের শিকার হন এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রাণ হারান অথবা স্থায়ী শারীরিক ক্ষতির মুখোমুখি হন। দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে এই সমস্যা তুলনামূলক বেশি।
বাংলাদেশে প্রায় শতাধিক প্রজাতির সাপের মধ্যে সীমিত সংখ্যক সাপ বিষধর। তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাব এবং কুসংস্কারের কারণে অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসা নিতে দেরি হয়, যা মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সাপের কামড়ের ঘটনায় আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তারা বলেন, আক্রান্ত ব্যক্তিকে শান্ত রাখতে হবে, অপ্রয়োজনীয় নড়াচড়া কমাতে হবে এবং যত দ্রুত সম্ভব হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। হাত-পা কেটে রক্ত বের করা, বিষ চুষে নেওয়া কিংবা ঝাড়ফুঁকের মতো পদ্ধতি সম্পূর্ণ অকার্যকর ও ঝুঁকিপূর্ণ।
দেশব্যাপী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে অ্যান্টিভেনম সহজলভ্য হওয়ায় সাপে কাটা রোগীদের চিকিৎসা আরও দ্রুত ও কার্যকর হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে চিকিৎসা ব্যবস্থার পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং কুসংস্কার থেকে বেরিয়ে আসাও সাপের কামড়ে মৃত্যুহার কমানোর অন্যতম প্রধান শর্ত।
