সাইবার স্পেস, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করে মাদক লেনদেনকে কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হলো
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে পরিচালিত মাদক ব্যবসা ও অবৈধ লেনদেনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। সাইবার স্পেস ও অনলাইনভিত্তিক মাদক অপরাধে জড়িতদের জন্য সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে ‘মাদক নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিলটি উত্থাপন করলে জনমত যাচাই, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সুপারিশ এবং সংশোধনী প্রস্তাব নিষ্পত্তির পর কণ্ঠভোটে এটি অনুমোদিত হয়।
সংশোধিত আইনে প্রযুক্তিনির্ভর মাদক অপরাধকে স্পষ্টভাবে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। নতুন বিধান অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মোবাইল অ্যাপ, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, ইলেকট্রনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা কিংবা অন্য কোনো অনলাইন মাধ্যম ব্যবহার করে মাদকদ্রব্য কেনাবেচা, সরবরাহ, প্রচার, যোগাযোগ বা সহায়তা প্রদান করেন, তাহলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
আইনে আরও বলা হয়েছে, ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেম, ই-ওয়ালেট, ভার্চুয়াল সম্পদ বা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে মাদক-সংক্রান্ত লেনদেন পরিচালনা বা তার চেষ্টা করাও দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।
নতুন আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটিত মাদক অপরাধের ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছ থেকে সরাসরি মাদক উদ্ধার হওয়া বাধ্যতামূলক নয়। তদন্তে প্রযুক্তিগত প্রমাণ ও অন্যান্য তথ্যের ভিত্তিতেই বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনলাইনভিত্তিক অপরাধ দমনে এটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করবে।
আইন অনুযায়ী, অপরাধের ধরন ও মাত্রা বিবেচনায় দোষী ব্যক্তিকে যেকোনো মেয়াদের কারাদণ্ড থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধানও রাখা হয়েছে।
যদি কোনো অপরাধ আন্তর্জাতিক চক্র বা সংঘবদ্ধ অপরাধ নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে সংঘটিত হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সেক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা জরিমানা, কারাদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড দেওয়া যেতে পারে।
সংশোধিত আইনের আওতায় আদালত বা মাদক অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল প্রয়োজন হলে ডিজিটাল অ্যাকাউন্ট, ই-ওয়ালেট, ভার্চুয়াল সম্পদ, ক্রিপ্টোকারেন্সি, ডিজিটাল ডিভাইস এবং সংশ্লিষ্ট অনলাইন প্ল্যাটফর্ম জব্দ, বাজেয়াপ্ত বা রাষ্ট্রের অনুকূলে নিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিতে পারবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরাধ থেকে অর্জিত অর্থ ও সম্পদের উৎস বন্ধ করতে এ বিধান কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
সংশোধিত আইনে সাধারণ আদালতের পাশাপাশি মাদকপ্রবণ এলাকায় পৃথক মাদক অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিধান পুনর্বহাল করা হয়েছে।
এ ছাড়া সাইবারভিত্তিক মাদক অপরাধ মোকাবিলায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে আগ্নেয়াস্ত্র বহন এবং বিশেষ ডগ স্কোয়াড গঠনের ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে।
বিলের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা চক্রের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রশাসনিক পদক্ষেপও নেওয়া হচ্ছে।
আইন বিশ্লেষকদের মতে, মাদক ব্যবসা এখন ক্রমেই অনলাইনভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে। ফলে প্রচলিত আইনের পাশাপাশি ডিজিটাল অপরাধ মোকাবিলার জন্য আধুনিক আইনগত কাঠামো প্রয়োজন ছিল। নতুন সংশোধনী সেই শূন্যতা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে তারা মনে করেন, আইনের কার্যকর প্রয়োগ, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং মানবাধিকার বিষয়ক ভারসাম্য রক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
অনলাইনভিত্তিক মাদক ব্যবসা দমনে কঠোর শাস্তির বিধান রেখে নতুন আইন পাস হওয়ায় প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সরকারের অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়েছে। এখন আইনটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে মাদক চক্রের ডিজিটাল নেটওয়ার্ক কতটা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সেটিই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
