ফারাক্কার চেয়েও ভয়াবহ ‘নেতৃত্বের ব্যর্থতা’, শিক্ষাব্যবস্থা ও কর্মসংস্থান নিয়ে প্রশ্ন এনসিপি নেতার
ঢাকা, ১৫ জুলাই: জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসির উদ্দীন পাটোয়ারী বলেছেন, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় সংকট শুধু অবকাঠামোগত বা ভৌগোলিক নয়; বরং রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও প্রকৃত সংস্কারের গুরুত্ব অনুধাবনে ব্যর্থতাই দেশের ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হয়ে উঠেছে। তিনি মনে করেন, দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর শিক্ষা সংস্কার ও কর্মসংস্থানমুখী পরিকল্পনার অভাবে একটি বড় অংশের তরুণ জনগোষ্ঠী অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
বুধবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি এসব মন্তব্য করেন। পোস্টে তিনি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, কর্মসংস্থান, রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণ এবং সাম্প্রতিক এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন।
নাসির উদ্দীন পাটোয়ারীর ভাষ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক দর্শন ও লক্ষ্য নির্ধারণে সুস্পষ্ট অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি। তিনি বলেন, বিদ্যমান শিক্ষা কাঠামো দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির পরিবর্তে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধিতে বেশি ভূমিকা রাখছে।
তার মতে, বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা—এই প্রচলিত ধারার বাইরে বাস্তবমুখী ও কর্মসংস্থান-উপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পরও বিপুলসংখ্যক তরুণ কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
এনসিপির এই নেতা বলেন, দেশের অর্থনীতি এখনও মূলত তৈরি পোশাক শিল্প এবং বিদেশগামী শ্রমশক্তির রেমিট্যান্সনির্ভর। এমন বাস্তবতায় নতুন প্রজন্মের শিক্ষিত তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মক্ষেত্র তৈরি না করে ধারাবাহিকভাবে নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের প্রবণতা দেখা গেছে।
তিনি মনে করেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব শুধু প্রতিষ্ঠান বৃদ্ধি নয়; বরং রাষ্ট্রের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ, উদ্ভাবনী ও প্রতিযোগিতামূলক জনশক্তি তৈরি করা।
পাটোয়ারী তার পোস্টে রাষ্ট্র পরিচালনায় দূরদর্শিতার অভাব এবং দলীয় রাজনৈতিক সংকীর্ণতাকে বর্তমান পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার দাবি, উন্নয়ন ও সংস্কারের নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি।
তিনি বলেন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারের প্রশ্নে কার্যকর উদ্যোগ না থাকলে পুরো একটি প্রজন্ম দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি জাতির জন্য গভীর সংকট সৃষ্টি করে।
সাম্প্রতিক এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক বলেন, তরুণরা এখন নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সচেতন এবং অন্যায্য সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে প্রস্তুত।
তার মতে, শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন কেবল একটি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে নয়; বরং এটি ন্যায়সঙ্গত শিক্ষা ব্যবস্থা, মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যৎ এবং নাগরিক অধিকারের প্রশ্নের সঙ্গে সম্পর্কিত।
তিনি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সাহস ও সচেতনতার প্রশংসা করে বলেন, ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গঠনে তরুণদের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষা ব্যবস্থা, কর্মসংস্থান সংকট, রাষ্ট্র সংস্কার এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা জোরালো হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সংগঠন শিক্ষা ও চাকরির বাজারের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধির দাবি জানিয়ে আসছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির যুগে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা ও কর্মমুখী প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব বাড়ানো না গেলে তরুণ জনগোষ্ঠীর বড় অংশ প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে।
শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ এবং শিল্প খাতের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থার সমন্বয় জরুরি।
নাসির উদ্দীন পাটোয়ারীর বক্তব্য নতুন করে শিক্ষা সংস্কার, কর্মসংস্থান এবং রাষ্ট্রীয় নীতির কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর প্রত্যাশা পূরণে বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ও দীর্ঘমেয়াদি নীতি গ্রহণই ভবিষ্যৎ উন্নয়নের অন্যতম শর্ত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
