বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এখন আর নতুন কোনো ঘটনা নয়। যুদ্ধ, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, সরবরাহ শৃঙ্খলের সংকট কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি—যেকোনো একটি কারণই কোনো দেশের জ্বালানি ব্যবস্থাকে চাপে ফেলতে পারে। এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৌশলগত তেল মজুত সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের মধ্যে দেশের জ্বালানি তেলের মজুত সক্ষমতা ৬০ দিন থেকে বাড়িয়ে ৯০ দিনে উন্নীত করা হবে।
জ্বালানি তেল একটি দেশের অর্থনীতি, শিল্প উৎপাদন, পরিবহন ব্যবস্থা এবং বিদ্যুৎ খাতের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো ধরনের অস্থিরতা দেখা দিলে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য জ্বালানি সরবরাহ বজায় রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। পর্যাপ্ত মজুত থাকলে এমন পরিস্থিতিতেও দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয় এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক রাখা যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৌশলগত জ্বালানি মজুত শুধু একটি অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কারণ জ্বালানি সংকট দেখা দিলে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি পরিবহন ও বিদ্যুৎ খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
বর্তমানে দেশে ৬০ দিনের বেশি জ্বালানি তেল মজুতের সক্ষমতা রয়েছে। সরকারের লক্ষ্য, চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে এই সক্ষমতা ৭১ দিনে উন্নীত করা এবং পরবর্তী ধাপে ২০২৭ সালের মধ্যে ৯০ দিনের মজুত নিশ্চিত করা।
এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও জ্বালানি বিভাগ নতুন ডিপো নির্মাণ, পুরোনো অবকাঠামো সংস্কার, অতিরিক্ত সংরক্ষণাগার তৈরি এবং সরকারি-বেসরকারি খাতের উদ্বৃত্ত ট্যাংক ব্যবহারের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।
জ্বালানি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালে দেশে সব ধরনের জ্বালানি তেলের মোট চাহিদা ৮৪ লাখ ২৬ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন হতে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাহিদা ডিজেলের, যা কৃষি, পরিবহন ও শিল্প খাতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
বর্তমানে বিপিসির আওতাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মোট সংরক্ষণ সক্ষমতা ১৫ লাখ টনের বেশি। তবে ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং ভবিষ্যৎ ঝুঁকি বিবেচনায় এই সক্ষমতা বাড়ানো সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।
জ্বালানি মজুত বৃদ্ধির অংশ হিসেবে দেশের বিভিন্ন স্থানে নতুন ডিপো ও ট্যাংক নির্মাণ করা হচ্ছে। সম্প্রতি দিনাজপুরের পার্বতীপুরে নতুন ডিপোর কার্যক্রম চালু হয়েছে, যা উত্তরাঞ্চলের জ্বালানি সংরক্ষণ সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে।
এ ছাড়া কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ, ফতুল্লা, ভৈরব এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নতুন সংরক্ষণ অবকাঠামো নির্মাণের কাজ চলছে। একই সঙ্গে কিছু পুরোনো ট্যাংক আধুনিকায়ন এবং কেরোসিন ও জেট ফুয়েল সংরক্ষণাগারকে ডিজেল সংরক্ষণের উপযোগী করে তোলার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি মজুত দ্রুত বাড়ানোর জন্য সরকার বিদ্যুৎকেন্দ্র, বাংলাদেশ রেলওয়ে, বিআরটিসিসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত সংরক্ষণাগার ব্যবহারের বিষয়টিও বিবেচনা করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন জমি অধিগ্রহণ ও বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের তুলনায় বিদ্যমান অবকাঠামোর সর্বোচ্চ ব্যবহার অনেক বেশি কার্যকর ও ব্যয়-সাশ্রয়ী হতে পারে। এতে কম সময়ে সংরক্ষণ সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা সম্ভব।
বিশ্বের উন্নত ও শিল্পোন্নত দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরেই কৌশলগত জ্বালানি মজুতকে গুরুত্ব দিয়ে আসছে। অনেক দেশে কয়েক মাসের জ্বালানি চাহিদা পূরণের মতো মজুত রাখা হয়, যাতে আন্তর্জাতিক সংকটের সময় সরবরাহ ব্যবস্থা সচল থাকে।
বাংলাদেশের ৯০ দিনের মজুত সক্ষমতা অর্জনের উদ্যোগও সেই বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিশেষ করে আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার কারণে দেশের জন্য এটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তা এবং জ্বালানি বাজারের পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন। তাই জ্বালানি তেলের কৌশলগত মজুত ৯০ দিনে উন্নীত করার সরকারি উদ্যোগকে বিশেষজ্ঞরা সময়োপযোগী এবং দূরদর্শী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
যদি পরিকল্পনাগুলো নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়িত হয়, তবে বাংলাদেশ শুধু সম্ভাব্য জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আরও সক্ষম হবে না, বরং শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও আরও শক্তিশালী ভিত্তি পাবে।
