রাজধানীর অন্যতম বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ নতুন গতি পেয়েছে। দীর্ঘদিনের আর্থিক, প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতা কাটিয়ে প্রকল্পটির বিভিন্ন অংশে এখন পুরোদমে কাজ চলছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা করছেন, সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই পান্থকুঞ্জ পার্ক-সংলগ্ন গুরুত্বপূর্ণ র্যাম্পটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া সম্ভব হবে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত বিমানবন্দর থেকে বনানী অংশের নির্মাণকাজ প্রায় সম্পূর্ণ হয়েছে। বনানী থেকে মগবাজার অংশের কাজও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। অন্যদিকে মগবাজার থেকে কুতুবখালী পর্যন্ত তৃতীয় ধাপের কাজ ধীরে হলেও এগোচ্ছে। সামগ্রিকভাবে প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি এখন প্রায় ৮০ শতাংশে পৌঁছেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে দেখা যায়, কারওয়ান বাজার থেকে মালিবাগ পর্যন্ত অধিকাংশ স্থানে গার্ডার স্থাপন ও ঢালাইয়ের কাজ শেষ হয়েছে। পান্থকুঞ্জ, হাতিরঝিল, মগবাজার, ওয়্যারলেস ও মালিবাগ এলাকায় দৃশ্যমান অগ্রগতি লক্ষ করা গেছে। খিলগাঁও, বাসাবো এবং যাত্রাবাড়ী অংশেও পিলার ও ক্রসবিম নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে।
প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে কারওয়ান বাজার থেকে পান্থকুঞ্জ পর্যন্ত সংযোগ র্যাম্প নির্মাণ করা হচ্ছে। হাতিরঝিল অতিক্রম করে এই র্যাম্প রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, পান্থকুঞ্জ এলাকায় এসে র্যাম্পটি দুই দিকে বিভক্ত হবে, যার একটি অংশ পলাশীর দিকে এবং অন্যটি বিমানবন্দরমুখী হবে।
তবে প্রকল্পটির অগ্রযাত্রা সবসময় মসৃণ ছিল না। নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের অংশীদারদের মধ্যে বিরোধ, অর্থায়ন সংকট এবং আদালতের নির্দেশনার কারণে বিভিন্ন সময়ে কাজ থমকে যায়। বিশেষ করে মালিবাগ থেকে কুতুবখালী অংশের নির্মাণকাজ প্রায় দেড় বছর স্থবির ছিল। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ বিরোধের কারণে অর্থায়নকারী চীনের এক্সিম ব্যাংক ঋণের অর্থ ছাড় স্থগিত করলে প্রকল্পে বড় ধরনের ধীরগতি দেখা দেয়।
পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) ভিত্তিতে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পের ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ‘ফার্স্ট ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে কোম্পানি লিমিটেড’-এর মালিকানা ও শেয়ার কাঠামো নিয়েও জটিলতা সৃষ্টি হয়েছিল। পরবর্তীতে অংশীদারদের মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তির পর নির্মাণকাজে নতুন করে গতি ফিরে আসে।
এ ছাড়া পান্থকুঞ্জ পার্ক ও হাতিরঝিল এলাকায় নির্মাণকাজ নিয়ে পরিবেশবাদীদের আইনি আপত্তির কারণেও প্রায় এক বছর কাজ বন্ধ ছিল। পরিবেশগত ক্ষতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পর আদালতের নির্দেশে ওই অংশে স্থিতাবস্থা বজায় রাখা হয়। পরে নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হলে ২০২৬ সালের শুরুতে আবার কাজ শুরু হয়।
ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের প্রকল্প পরিচালক এ এইচ এম এস আকতার জানান, মগবাজার থেকে মালিবাগ অংশের কাজ প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। মালিবাগ থেকে খিলগাঁও পর্যন্ত পিলার ও গার্ডার স্থাপনের কাজও শেষ পর্যায়ে রয়েছে। কমলাপুর স্টেশন ইয়ার্ড এবং যাত্রাবাড়ী অংশেও নির্মাণকাজ অব্যাহত আছে।
তিনি বলেন, “পান্থকুঞ্জ ও হাতিরঝিল এলাকায় দীর্ঘ সময় কাজ বন্ধ থাকায় প্রকল্প বাস্তবায়নে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। তারপরও আমরা ডিসেম্বরের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ র্যাম্প চালুর লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি। পুরো প্রকল্পের অগ্রগতি বর্তমানে প্রায় ৮০ শতাংশ।”
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান মনে করেন, বড় অবকাঠামো প্রকল্পে প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতা বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তার মতে, ভূমি অধিগ্রহণ, পরিবেশগত অনুমোদন ও আদালত-সংক্রান্ত বিষয়গুলো আগেই সমাধান করা গেলে প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় ও ব্যয় উভয়ই কমানো সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের পূর্ণ সুবিধা পেতে হলে এটিকে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে সমন্বিতভাবে চালু করা প্রয়োজন। এতে উত্তরাঞ্চল থেকে আসা ভারী যানবাহন রাজধানীতে প্রবেশ না করেই দক্ষিণাঞ্চল ও চট্টগ্রামমুখী সড়কপথে চলাচল করতে পারবে, যা ঢাকার যানজট কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বাকি কাজ নির্ধারিত গতিতে এগোলে রাজধানীর দীর্ঘদিনের যানজট সমস্যা নিরসনে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে। একই সঙ্গে এটি দেশের পণ্য পরিবহন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি সঞ্চার করবে।
