রাজধানী ঢাকায় ৭ থেকে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানলে বিপুল সংখ্যক স্থাপনা ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে সতর্ক করেছেন ভূতাত্ত্বিক ও নগর পরিকল্পনাবিদরা। তাদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে সাড়ে ৮ লাখের বেশি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধসে পড়তে পারে, যা বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ তিনটি সক্রিয় টেকটোনিক প্লেট—ইন্ডিয়ান, ইউরেশিয়ান ও বার্মা প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থান করায় ভূমিকম্পের ঝুঁকি সবসময়ই বিদ্যমান। ঢাকার কাছাকাছি মধুপুর ফল্ট এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ডাউকি ফল্টে দীর্ঘ সময় ধরে শক্তি সঞ্চিত থাকায় বড় ধরনের ভূমিকম্পের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মাঝারি মাত্রার কয়েকটি ভূমিকম্পের ঘটনা উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ছোট কম্পন ভূগর্ভে জমে থাকা শক্তির ইঙ্গিত বহন করে এবং ভবিষ্যতে বড় ধরনের ভূমিকম্পের সম্ভাবনার বার্তা দিতে পারে।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরী ও আশপাশের এলাকায় প্রায় ২১ লাখ স্থাপনা রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। একটি ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে প্রায় ৭২ হাজার ভবন সম্পূর্ণ ধসে পড়তে পারে এবং কয়েক লাখ মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। আরও বড় মাত্রার কম্পনের ক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বহুগুণ বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. মেহেদী আহমেদ আনসারীর মতে, ঢাকার অনেক এলাকা জলাশয় ভরাট করে নির্মিত হওয়ায় সেসব স্থানের মাটি ভূমিকম্পের সময় তরলীকরণের (লিকুইফ্যাকশন) ঝুঁকিতে থাকে। এতে বহুতল ভবন হেলে পড়া বা মাটিতে দেবে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে।
তিনি বলেন, ভূমিকম্পের সময় নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। তাই আগাম প্রস্তুতির বিকল্প নেই। বিশেষ করে ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে দ্রুত সংস্কারের আওতায় আনা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ঢাকার ঝুঁকি বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে জলাশয় ভরাট করে নির্মাণ, বিল্ডিং কোড অমান্য করে ভবন নির্মাণ, সংকীর্ণ সড়কব্যবস্থা, অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের নিয়মিত পরিদর্শনের অভাব এবং জরুরি উদ্ধার সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা। এছাড়া গ্যাস, পানি ও স্যুয়ারেজ অবকাঠামোর ক্ষতি থেকে ভূমিকম্প-পরবর্তী অগ্নিকাণ্ড ও অন্যান্য দুর্যোগের আশঙ্কাও রয়েছে।
রাজউকের প্রধান প্রকৌশলী মো. আমিনুর রহমান বলেন, নতুন ভবন নির্মাণে মানদণ্ড নিশ্চিত করার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তবে ভূমিকম্প ঝুঁকি কমাতে আরও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সঠিক পরিকল্পনা ও প্রকৌশলগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। এ জন্য জাতীয় ভবন নির্মাণ বিধিমালা (বিএনবিসি) কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের রেট্রোফিটিং, উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণ, কমিউনিটি পর্যায়ে প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি এবং উদ্ধার সক্ষমতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
তাদের মতে, ঢাকার ওপর জনসংখ্যার চাপ কমাতে বিকেন্দ্রীকরণ নীতি গ্রহণ, স্যাটেলাইট শহর গড়ে তোলা, পুরান ঢাকার সড়ক সম্প্রসারণ এবং পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র তৈরির মতো দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপও জরুরি। সময়মতো এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে সম্ভাব্য বড় ধরনের ভূমিকম্পে প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
