সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমে গতি আনা, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা জোরদার করা এবং বিভিন্ন বিতর্ক এড়িয়ে কার্যক্রম আরও কার্যকর করার লক্ষ্যে শিগগিরই মন্ত্রিসভায় বড় ধরনের রদবদল হতে পারে বলে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে আলোচনা চলছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সড়ক পরিবহন ও কৃষিসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে পরিবর্তনের পাশাপাশি মন্ত্রিসভার পরিধি বৃদ্ধির বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার ৫০ সদস্যের মন্ত্রিসভা নিয়ে কাজ করছে। তবে অতীতের ধারাবাহিকতার মতো সময়ের সঙ্গে মন্ত্রিসভার আকার আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা স্মরণ করিয়ে দেন, অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ৪৬ সদস্যের মন্ত্রিসভা গঠন করলেও পরবর্তীতে তা ৬০ সদস্যে উন্নীত হয়েছিল।
রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, সম্ভাব্য এই পুনর্বিন্যাসে কয়েকজন অভিজ্ঞ রাজনীতিককে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা পরিষদেও যুক্ত করা হতে পারে।
এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, “এটি কোনো বিচিত্র ব্যাপার নয়, বরং অত্যন্ত স্বাভাবিক বিষয়। সংসদীয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন আসাটাই নিয়ম। তবে তার মানে এই নয় যে, এটি এখনই হবে কিংবা নির্দিষ্ট কোনো সময়েই হতে হবে। এগুলো নিয়ে কথা বলার একমাত্র এখতিয়ার প্রধানমন্ত্রীর। তিনি যখন উপযুক্ত বিবেচনা করবেন, তখনই কাউকে নতুন দায়িত্ব দিতে পারেন কিংবা কারও দায়িত্ব পরিবর্তন করতে পারেন।”
সম্ভাব্য রদবদলের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। দুর্যোগকালীন পরীক্ষা আয়োজনসংক্রান্ত কয়েকটি সিদ্ধান্ত ও বক্তব্য নিয়ে সরকার বিব্রত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
আলোচনায় রয়েছে, বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলনকে অন্য দায়িত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহাদী আমিনকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। শিক্ষা খাতে সংস্কার কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে তরুণ নেতৃত্বকে সামনে আনার চিন্তা থেকে এ ধরনের আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়েও পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। একাধিক সূত্রের দাবি, বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও সেমিনারে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুলের কিছু বক্তব্য নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনার পর আদ-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স স্থগিতের প্রেক্ষাপটে দেওয়া একটি বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। পরে আদ-দ্বীন ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ডা. শেখ মহিউদ্দিন ওই অভিযোগের প্রতিবাদ জানিয়ে বক্তব্যের প্রমাণ দাবি করেন।
এ ছাড়া কয়েক দিন আগে ঢাকা মেডিকেল কলেজের একটি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে মূল আলোচ্য বিষয়ের বাইরে কথা না বলার পরামর্শ দেওয়া হয়। এসব ঘটনার পর তাঁকে অন্য মন্ত্রণালয়ে সরিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনার কথা শোনা যাচ্ছে। সে ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিতকে পূর্ণমন্ত্রী করার বিষয়টি বিবেচনায় আসতে পারে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
রদবদলের মাধ্যমে মন্ত্রিসভায় অভিজ্ঞ সংসদ সদস্য, প্রবীণ রাজনীতিক এবং কিছু তরুণ মুখের অন্তর্ভুক্তির সম্ভাবনা রয়েছে। কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক দুর্বলতা ও কাজের ধীরগতিও সরকারের নজরে এসেছে বলে জানা গেছে।
সূত্রের দাবি, একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা কয়েকজন মন্ত্রীর দায়িত্ব পুনর্বিন্যাস করা হতে পারে। তিনটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা এক মন্ত্রীর একটি দপ্তরের দায়িত্ব সংসদ সদস্য শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের কাছে দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা রয়েছে। পাশাপাশি একজন প্রতিমন্ত্রীর দপ্তর পরিবর্তনের সম্ভাবনার কথাও শোনা যাচ্ছে।
নোয়াখালী অঞ্চলের একজন প্রবীণ নেতাকে মন্ত্রিসভায় নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ছয়বারের সংসদ সদস্য ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জয়নুল আবদিন ফারুকের নাম আলোচনায় রয়েছে।
নতুন মন্ত্রী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক, এ বি এম মোশাররফ হোসেন, আব্দুস সালাম আজাদ, অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া, খন্দকার আবু আশফাক, নজরুল ইসলাম আজাদ এবং মো. মজিবুর রহমান।
টেকনোক্র্যাট কোটায় সম্ভাব্য নামের মধ্যে রয়েছেন অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী, শামসুজ্জামান দুদু, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল এবং হাবিব উন নবী খান সোহেল।
এ ছাড়া জোটের শরিক দলগুলোর পক্ষ থেকেও কয়েকজন নেতার নাম আলোচনায় রয়েছে। তাঁদের মধ্যে আন্দালিব রহমান পার্থ অন্যতম।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, “মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন আসতে পারে। তবে কবে নাগাদ আসবে এটি একমাত্র প্রধানমন্ত্রী বলতে পারেন।”
বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, “কী হবে তা আমরা জানি না। ফেসবুকে দেখা যাচ্ছে অনেকে মন্ত্রী হবেন, রদবদল হবে।”
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদীন বলেন, “পরিবর্তন হতে পারে। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী ভালো বলতে পারবেন। যদি পরিবর্তন হয়, তবে দেশ ও জনগণের স্বার্থে কাকে মন্ত্রিপরিষদে যুক্ত করা যায়, তা তিনিই ভালো বোঝেন।”
অন্যদিকে বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ বলেন, “বিষয়টি আমার নলেজে নেই।”
সরকারের দায়িত্বশীল বিভিন্ন সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, উন্নয়ন এজেন্ডা বাস্তবায়ন এবং প্রশাসনিক কার্যকারিতা বাড়ানোর লক্ষ্যেই সম্ভাব্য রদবদলের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও আনুষ্ঠানিক ঘোষণার জন্য প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের দিকে নজর রয়েছে।
