স্থানীয় সরকার নির্বাচনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে বিদ্যমান আইন ও বিধিমালায় ব্যাপক সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আগামী অক্টোবরের স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের জন্য অভিন্ন ও আরও কঠোর আইনি কাঠামো প্রণয়নের প্রস্তুতি চলছে।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনসংক্রান্ত বিভিন্ন আইনের সংশোধনী খসড়া প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। শিগগিরই তা পর্যালোচনার জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। প্রয়োজনীয় সরকারি ও সংসদীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর নতুন বিধান কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সংস্কার প্রস্তাবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংজ্ঞায় সশস্ত্র বাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করা। বর্তমানে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিশেষ পরিস্থিতিতে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী মোতায়েনের সুযোগ থাকলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে এ বিষয়ে আইনি অসামঞ্জস্য রয়েছে।
ইসি মনে করছে, সব ধরনের স্থানীয় নির্বাচনে একই নিরাপত্তা কাঠামো নিশ্চিত করা গেলে সহিংসতা, কেন্দ্র দখল এবং নির্বাচনী অনিয়ম মোকাবিলা আরও কার্যকর হবে।
প্রস্তাবিত সংশোধনী অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চার্জশিটভুক্ত কোনো ব্যক্তি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। একই সঙ্গে রাষ্ট্রদ্রোহ বা গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত পলাতক আসামিদেরও নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার বিধান রাখা হচ্ছে।
ইসি কর্মকর্তাদের মতে, স্থানীয় নেতৃত্বকে বিতর্কমুক্ত ও গ্রহণযোগ্য রাখতে এ ধরনের কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন।
নতুন প্রস্তাবে শুধু ঋণখেলাপিদের নয়, ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের অংশীদার পরিচালক এবং ঋণখেলাপিদের গ্যারান্টার বা জামিনদারদেরও নির্বাচনে অযোগ্য করার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের ধারণা, এর মাধ্যমে আর্থিকভাবে অস্বচ্ছ ব্যক্তিদের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ সীমিত হবে এবং সৎ প্রার্থীদের সুযোগ বাড়বে।
প্রার্থীদের দেওয়া হলফনামার তথ্য যাচাইয়ে আরও কঠোর অবস্থান নিতে যাচ্ছে ইসি। প্রস্তাবিত বিধান অনুযায়ী, সম্পদ, মামলা, শিক্ষাগত যোগ্যতা বা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন বা মিথ্যা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা যাবে। নির্বাচিত হওয়ার পরও এমন তথ্য প্রমাণিত হলে তার প্রার্থিতা বাতিলের সুযোগ রাখা হচ্ছে।
এ ছাড়া প্রার্থীর ওপর নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের সম্পদসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রেও অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দ্বৈত নাগরিকত্ব এবং সরকারের কোনো লাভজনক পদে বহাল থাকা ব্যক্তিদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে বিদ্যমান আইনের অস্পষ্টতা দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সব স্থানীয় সরকার আইনে এ বিষয়ে একই ধরনের বিধান যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বর্তমানে বিভিন্ন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনী সময়সীমা ভিন্ন হওয়ায় নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় জটিলতা তৈরি হয়। এ সমস্যা দূর করতে সব ধরনের স্থানীয় সরকারের নির্বাচনের জন্য সমন্বিত সময়সীমা নির্ধারণের চিন্তা করছে কমিশন।
একই সঙ্গে দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকদের অংশগ্রহণ, অধিকার ও আচরণবিধির ক্ষেত্রেও অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
‘নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধ’ বিষয়ক আইনি ব্যাখ্যা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক দূর করতে এ ধরনের অপরাধের সংজ্ঞা আরও নির্দিষ্ট করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে গুরুতর অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত হবে বলে মনে করছে কমিশন।
নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, “আমরা মূলত সব স্থানীয় সরকার আইনের মধ্যে সমতা আনার চেষ্টা করছি। কোনো আইনে যে বিধান থাকবে, অন্য আইনেও তা একইভাবে প্রযোজ্য হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংজ্ঞায় সেনাবাহিনী অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চার্জশিটভুক্ত ব্যক্তিদের অযোগ্যতা, হলফনামা এবং নির্ভরশীলদের তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রেও কঠোরতা বজায় থাকবে।”
তিনি জানান, কমিশনের পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ সরকারকে জানানো হবে এবং আইন পাস হওয়ার পর তা কার্যকর হবে।
নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে আরও বিশ্বাসযোগ্য ও জবাবদিহিমূলক করতে এই সংস্কার উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে নতুন আইন প্রণয়নের পাশাপাশি তার নিরপেক্ষ ও কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
তাদের মতে, প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলো বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে স্বচ্ছতা ও অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে।
