বাংলাদেশে প্রস্তাবিত জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নীতিমালাকে প্রযুক্তি খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হলেও এর বাস্তবায়ন সক্ষমতা, ডাটা নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও দক্ষ মানবসম্পদ ছাড়া নীতিমালার সুফল পুরোপুরি পাওয়া কঠিন হবে।
বাংলাদেশ বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির ক্ষেত্রে মূলত ব্যবহারকারী দেশ হিসেবে পরিচিত হলেও উৎপাদন ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে এখনো পিছিয়ে রয়েছে। ২০২৫ সালে প্রণীত ব্যক্তিগত ডাটা সুরক্ষা অধ্যাদেশ (পিডিপিও) এবং জাতীয় ডাটা গভর্ন্যান্স অধ্যাদেশ এ খাতে একটি আইনি ভিত্তি তৈরি করলেও বাস্তব প্রস্তুতিতে ঘাটতি রয়ে গেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই নীতি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, প্রশিক্ষিত জনবল, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং অবকাঠামো এবং নিজস্ব ক্লাউড প্ল্যাটফর্মের অভাব রয়েছে। ফলে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনের পথে নানা চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান।
প্রস্তাবিত নীতিমালাটি ঝুঁকিভিত্তিক কাঠামোর ওপর নির্মিত, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের এআই অ্যাক্টের আদলে তৈরি হয়েছে। এতে এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রগুলোকে বিভিন্ন ঝুঁকি পর্যায়ে ভাগ করা হয়েছে। ইউনেস্কো, ওইসিডি ও আসিয়ানের নির্দেশনাও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তবে সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তিগতভাবে সক্ষম ও স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা ছাড়া নীতিমালার কার্যকারিতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। এছাড়া নীতিমালাটি পূর্ণাঙ্গ আইনে পরিণত হতে আরও কয়েক বছর সময় লাগতে পারে, ফলে একটি আইনি শূন্যতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
জাতীয় পরিচয়পত্র, স্মার্টকার্ড ও বায়োমেট্রিক তথ্যের নিরাপত্তা এখন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে সামনে এসেছে। অতীতে এনআইডি ডাটাবেজ থেকে তথ্য ফাঁসের ঘটনা দেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা তুলে ধরেছে।
বর্তমান পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের ৫২ শতাংশ ব্যাংক উচ্চ নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে এবং প্রতিদিন গড়ে ৬৩০টি সাইবার হামলার চেষ্টা শনাক্ত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা নিরীক্ষা ও নিয়মিত পেনিট্রেশন টেস্টিং নিশ্চিত না হলে ডাটা সুরক্ষার ঝুঁকি থেকেই যাবে।
নীতিমালার একটি ইতিবাচক দিক হলো রাজনৈতিক মতামত, সমালোচনা কিংবা সাংবাদিকতাকে এআই-সংশ্লিষ্ট ক্ষতিকর কনটেন্ট হিসেবে চিহ্নিত না করার ঘোষণা। তবে ডিপফেক ও অপতথ্য নিয়ন্ত্রণের কিছু অস্পষ্ট বিধান ভবিষ্যতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে উদ্বেগের কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন সমালোচকরা।
অন্যদিকে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবে ডাটা এন্ট্রি ও ওয়েব স্ক্র্যাপিংয়ের মতো কিছু খাতে কাজের চাহিদা কমে যাওয়ায় ফ্রিল্যান্সারদের একাংশ ইতোমধ্যে প্রভাব অনুভব করছেন। যদিও নীতিমালায় দক্ষতা উন্নয়নের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে, তবুও বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণ উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের বাস্তবতায় দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। বর্তমানে শহরাঞ্চলে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর হার ৬৮ শতাংশ হলেও গ্রামীণ এলাকায় তা ৩৮ শতাংশ, যা ডিজিটাল বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তথ্য অনুযায়ী, অটোমেশনের কারণে তৈরি পোশাক খাতের প্রায় ৬০ দশমিক ৮ শতাংশ বা প্রায় ২৭ লাখ শ্রমিকের চাকরি ঝুঁকির মুখে রয়েছে। ২০৪১ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ৫৪ লাখে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ আরিফ মঈনুদ্দীন বলেন, “বাংলাদেশ এখনো এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রস্তুতির প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। প্রযুক্তি গ্রহণে আমরা দ্রুত হলেও তা নিরাপদ ও টেকসই করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও সমন্বয়ের ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতিমালার খসড়া একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে এটি কার্যকর করতে স্বাধীন ও প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ গঠন জরুরি। একই সঙ্গে নাগরিকের তথ্য সুরক্ষা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং উদ্ভাবনী কার্যক্রমের ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে।”
আরিফ মঈনুদ্দীনের মতে, এআই, মেশিন লার্নিং ও সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে আধুনিক শিক্ষাক্রম এবং দক্ষ জনবল তৈরিতে দ্রুত বিনিয়োগ না করলে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদে বিদেশি প্রযুক্তি ও পরামর্শকের ওপর নির্ভরশীল থেকে যাবে।
বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নে, জাতীয় এআই নীতিমালা ২০২৬-২০৩০ বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তরের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে প্রযুক্তিগত অবকাঠামো উন্নয়ন, সাইবার নিরাপত্তা জোরদার, দক্ষ মানবসম্পদ গঠন এবং ডিজিটাল বৈষম্য কমানোর ওপর। অন্যথায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনার পাশাপাশি নতুন ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
