হুতি বাহিনীর ঘোষিত অবরোধের কারণে বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে জাহাজ চলাচল অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। এর ফলে এশিয়ার জ্বালানি বাজারে নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সুয়েজ খাল কিছুটা বিকল্প পথ দিলেও তা পুরো সংকটের সমাধান করতে পারবে না।
২২ জুলাই ২০২৬ প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলীয় ইয়ানবু বন্দর থেকে এশিয়ার উদ্দেশে রওনা হওয়া দুটি তেলবাহী ট্যাংকার হুতি অবরোধ ঘোষণার পর লোহিত সাগরে দিক পরিবর্তন করেছে। জাহাজ দুটি—রোডোস (Rodos) ও সিন লং ইয়াং (Xin Long Yang)—মোট ২৮ লাখ ব্যারেল সৌদি অপরিশোধিত তেল বহন করছিল।
শিপিং বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেপলার (Kpler) জানিয়েছে, জাহাজ দুটি প্রথমে বাব আল-মান্দেবের দিকে এগোলেও পরে উত্তরমুখী হয়ে যায়। এটিই সৌদি তেল রপ্তানিতে হুতি হুমকির প্রথম দৃশ্যমান প্রভাব হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের চলমান সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল আগেই মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এর প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল ইয়ানবু বন্দরে এনে লোহিত সাগর দিয়ে রপ্তানি করছিল।কিন্তু বাব আল-মান্দেবও এখন ঝুঁকির মুখে পড়ায় সেই বিকল্প করিডোরের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ফলে এশিয়ার বিভিন্ন তেল পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠান নতুন রুট বিবেচনা করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, একটি সম্ভাব্য বিকল্প হলো ইয়ানবু থেকে তেল সুয়েজ খাল পেরিয়ে ভূমধ্যসাগরে নিয়ে যাওয়া, এরপর আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত কেপ অব গুড হোপ ঘুরে এশিয়ায় পৌঁছানো।তবে এই পথ ব্যবহারে পরিবহন সময় কয়েক সপ্তাহ বেড়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে জ্বালানি ব্যয়, ভাড়া ও বীমা খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
কেপলারের হিসাব অনুযায়ী, ইয়ানবু থেকে দক্ষিণ কোরিয়ায় সরাসরি যাত্রায় যেখানে প্রায় ২৪ দিন লাগে, বিকল্প রুটে সময় বেড়ে ৫৪ দিন পর্যন্ত হতে পারে।যুদ্ধের আগে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো। বর্তমানে ইরানের বিধিনিষেধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপের কারণে সেখানে চলাচল ব্যাপকভাবে কমে গেছে।
মঙ্গলবার কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ দিয়ে মাত্র তিনটি পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করেছে। কোনো বৃহৎ তেলবাহী ট্যাংকার বা এলএনজি জাহাজ সেখানে দেখা যায়নি।ইরাক, কাতার, কুয়েত ও বাহরাইন প্রায় পুরোপুরি হরমুজের ওপর নির্ভরশীল। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতেরও নির্ভরতা বেশি হলেও তাদের বিকল্প পাইপলাইন অবকাঠামো রয়েছে।জুন মাসে ইয়ানবু বন্দর দিয়ে দৈনিক প্রায় ৪১ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি হয়েছে, যা হরমুজ দিয়ে যাওয়া সম্ভাব্য সৌদি তেলের প্রায় ৬৪ শতাংশ।
সোমবার হুতি বাহিনী সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণা করে। এর কয়েকদিন আগে তারা সানার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার প্রতিক্রিয়ায় সৌদি আরবকে অবরোধের হুমকি দিয়েছিল।কেপলার জানিয়েছে, ইয়ানবু থেকে তেল বোঝাই ১২টি জাহাজ এখনো লোহিত সাগরে অবস্থান করছে। আরও দুটি জাহাজ বাব আল-মান্দেবের কাছে তাদের স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা বন্ধ করে দিয়েছে।কেপলারের বিশ্লেষক ইমানুয়েল বেলোস্ত্রিনো ও জাশান প্রেমা বলেন, “জাহাজগুলোর এই গতিবিধি প্রমাণ করে যে অবরোধের হুমকি ইতোমধ্যে সৌদি তেল পরিবহনে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।”
বাব আল-মান্দেব দিয়ে বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৬০ লাখ ব্যারেল তেল এশিয়ায় যায়। এর দুই-তৃতীয়াংশই সৌদি আরব থেকে আসে। এছাড়া রাশিয়ার প্রায় ১৯ লাখ ব্যারেল তেলও এই পথ ব্যবহার করে এশিয়ায় পৌঁছায়।সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে ভারত। দেশটির অর্ধেকেরও বেশি অপরিশোধিত তেল আমদানি বাব আল-মান্দেব হয়ে আসে। পাশাপাশি উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আমদানি করা প্রায় অর্ধেক তেল হরমুজের ওপর নির্ভরশীল।এ ছাড়া পাকিস্তানের ৩৬ শতাংশ, ফিলিপাইনের ৩৭ শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়ার ৩১ শতাংশ, জাপানের ২৮ শতাংশ, তাইওয়ানের ২২ শতাংশ এবং চীনের ১৯ শতাংশ তেল আমদানি বাব আল-মান্দেব রুটের সঙ্গে যুক্ত।
বিশ্লেষকদের মতে, সুয়েজ খাল ব্যবহার করলেও বড় ধরনের প্রযুক্তিগত ও লজিস্টিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে।সৌদি তেলের বেশিরভাগই ভেরি লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার (VLCC) জাহাজে পরিবহন করা হয়। তবে পূর্ণ বোঝাই VLCC সুয়েজ খাল দিয়ে চলাচল করতে পারে না, কারণ এগুলোর গভীরতা খালের সীমার চেয়ে বেশি।ফলে হয় মিসরের SUMED পাইপলাইন ব্যবহার করে কিছু তেল নামাতে হবে, অথবা তুলনামূলক ছোট সুয়েজম্যাক্স ট্যাংকার ব্যবহার করতে হবে। উভয় ক্ষেত্রেই ব্যয় ও সময় বাড়বে।কেপলারের ক্রুড অয়েল বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান হোমায়ুন ফালাকশাহি বলেন, বর্তমান রপ্তানি সক্ষমতা ধরে রাখতে হলে টার্মিনালের উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে। অন্যথায় সরবরাহ ব্যবস্থাই সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
একই প্রতিষ্ঠানের জ্বালানি বিশ্লেষক সুমিত রিটোলিয়া বলেন, দীর্ঘ সমুদ্রপথের কারণে জ্বালানি ব্যবহার, জাহাজের চাহিদা, বীমা প্রিমিয়াম ও পরিবহন ব্যয় সবই বাড়বে।বিশেষজ্ঞদের মতে, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র বা ভেনেজুয়েলা থেকে অতিরিক্ত তেল আমদানি একটি বিকল্প হতে পারে। তবে এসব ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে।রিটোলিয়ার মতে, অবরোধ আরও বিস্তৃত হলে এশিয়ার ক্রেতাদের জন্য রাশিয়ার তেলও ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। অন্যদিকে জ্বালানি গবেষক মার্ক আয়ুব বলেন, ইউক্রেনের হামলার কারণে রাশিয়ার পরিশোধন খাতও চাপের মধ্যে রয়েছে।তিনি আরও উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের পরিশোধনাগারগুলো প্রায় পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে এবং সেখানে জ্বালানি মজুত নিয়েও চাপ রয়েছে।
বিশ্লেষকদের অভিমত, সুয়েজ খাল কিছুটা স্বস্তি দিতে পারলেও হরমুজ ও বাব আল-মান্দেবের বিকল্প হিসেবে পুরোপুরি কার্যকর নয়।তাদের মতে, যদি দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রণালিতেই দীর্ঘমেয়াদে অস্থিরতা অব্যাহত থাকে, তাহলে এশিয়ার আমদানিকারকদের ব্যয় বাড়বে, বৈশ্বিক শিপিং খরচ বৃদ্ধি পাবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ওপর আরও ঊর্ধ্বমুখী চাপ সৃষ্টি হবে।
