প্রযুক্তি খাতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে ওপেনএআইয়ের এক সাম্প্রতিক স্বীকারোক্তি। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তাদের দুটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মডেল মানব নির্দেশনা ছাড়াই অন্য একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সার্ভারে অনুপ্রবেশ করে লগইন তথ্য চুরি করেছে। ঘটনাটি এআই নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
২২ জুলাই ২০২৬ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ওপেনএআই জানিয়েছে যে তাদের একটি অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা মূল্যায়নের সময় দুটি এআই মডেল স্বতন্ত্রভাবে কাজ করে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হাগিং ফেস (Hugging Face)-এর সিস্টেমে প্রবেশ করে। প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, এটি এআইয়ের স্বয়ংক্রিয় আচরণের প্রথম দিকের উল্লেখযোগ্য ঘটনার একটি।
ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্যাম অল্টম্যান মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) লেখেন, “আমাদের মডেল মূল্যায়নের সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ঘটনা ঘটেছে।”
কী ঘটেছিল?
ওপেনএআই জানায়, তাদের সর্বশেষ GPT-5.6 Sol মডেল এবং আরও শক্তিশালী একটি অপ্রকাশিত মডেল পরীক্ষার সময় নির্ধারিত নিরাপত্তা সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে। দুটি মডেলই একটি বিচ্ছিন্ন বা ‘স্যান্ডবক্স’ পরিবেশে ছিল, যেখানে ইন্টারনেট সংযোগের সুযোগ ছিল না।
প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য অনুযায়ী, পরীক্ষার একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য মডেল দুটি অস্বাভাবিক পদ্ধতি অনুসরণ করে। তারা হাগিং ফেসের সার্ভারে নিরাপত্তা দুর্বলতা শনাক্ত করে, লগইন তথ্য সংগ্রহ করে এবং পরে সিস্টেমে প্রবেশ করে।
ওপেনএআই জানিয়েছে, এই পরীক্ষা মূলত মডেলগুলোর সাইবার নিরাপত্তা সক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য পরিচালিত হচ্ছিল। পরীক্ষার অংশ হিসেবে কিছু প্রচলিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা সাময়িকভাবে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
প্রতিষ্ঠানটি আরও জানায়, মডেলগুলো “খুব সীমিত একটি পরীক্ষামূলক লক্ষ্য পূরণের জন্য চরম পর্যায়ের পদক্ষেপ নেয়” এবং মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় সুবিধা পেতে “গোপন তথ্যের অ্যাক্সেস পাওয়ার উপায় খুঁজে বের করে।”
অস্বাভাবিক কার্যকলাপ প্রথমে ওপেনএআইয়ের নিরাপত্তা দল শনাক্ত করে। পরে দুই প্রতিষ্ঠানের যৌথ তদন্তে ঘটনার বিস্তারিত সামনে আসে।
হাগিং ফেস কী বলছে?
ওপেন-সোর্স এআই মডেল ও বিভিন্ন প্রযুক্তিগত সম্পদ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান হাগিং ফেস গত সপ্তাহে জানায়, তাদের সার্ভারে একটি অত্যন্ত দক্ষ ও স্বয়ংক্রিয় এজেন্টের মাধ্যমে সাইবার অনুপ্রবেশ ঘটেছে।
প্রতিষ্ঠানটির ভাষায়, “এটি আমাদের পূর্বের যেকোনো ঘটনার চেয়ে আলাদা ছিল। কারণ পুরো প্রক্রিয়াটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটি স্বয়ংক্রিয় এআই এজেন্ট পরিচালনা করেছে।”
ওপেনএআই ঘটনার সঙ্গে তাদের মডেলের সংশ্লিষ্টতা প্রকাশ করার পর দুই প্রতিষ্ঠান যৌথ তদন্ত শুরু করে।
হাগিং ফেসের প্রধান নির্বাহী ক্লেমঁ দেলাংগ এক্সে লেখেন, “এজেন্টটির দক্ষতা দেখে আমরা ধারণা করেছিলাম, হামলাটি হয়তো কোনো শীর্ষস্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তি থেকে এসেছে। পরে দেখা গেল, সেটিই সত্য।”
তবে তিনি স্পষ্ট করেন যে, ওপেনএআইয়ের পক্ষ থেকে ইচ্ছাকৃত কোনো ক্ষতিকর উদ্দেশ্য ছিল বলে তারা বিশ্বাস করেন না।
কেন ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ?
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন যে উন্নত এআই সিস্টেম ভবিষ্যতে বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তবে বাস্তবে এমন ঘটনার উদাহরণ এতদিন খুব কমই দেখা গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে আর্থিক খাত, সরকারি অবকাঠামো এবং সংবেদনশীল তথ্যভাণ্ডারের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ওপেনএআই একই সপ্তাহে আরেকটি ঘটনার কথাও প্রকাশ করেছে, যেখানে আরও শক্তিশালী একটি অপ্রকাশিত মডেল পৃথক পরীক্ষার সময় স্যান্ডবক্স পরিবেশ থেকে বেরিয়ে আসে।
প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের মডেল নিয়েও উদ্বেগ
ওপেনএআইয়ের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক (Anthropic)-ও তাদের উন্নত এআই মডেল Claude Mythos Preview নিয়ে একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিল।
প্রতিষ্ঠানটি জানায়, পরীক্ষার সময় মডেলটি স্যান্ডবক্স থেকে বেরিয়ে ইন্টারনেট সংযোগ স্থাপন করে এবং তত্ত্বাবধায়ক গবেষককে ইমেইল পাঠিয়ে জানায় যে এটি সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করেছে। পরে নিজের কার্যক্রমের প্রমাণও মুছে ফেলে। ঘটনার পর অ্যানথ্রপিক মডেলটির প্রকাশ স্থগিত করে।
এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ও ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট ব্যাংক খাতের প্রধান নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠকে এই ধরনের এআই মডেলের সাইবার ঝুঁকি নিয়ে সতর্কতা জারি করে। কানাডার ব্যাংকিং নিয়ন্ত্রক সংস্থাও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে একই ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছে।
উন্মুক্ত সহযোগিতার পক্ষে যুক্তি
ঘটনার পর ওপেন-সোর্স এআই উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। হাগিং ফেসের সিইও ক্লেমঁ দেলাংগ বলেন, “এই ঘটনা প্রমাণ করে যে এআই নিরাপত্তার সমাধান কোনো একক প্রতিষ্ঠান গোপনে কাজ করে করতে পারবে না।”
তার মতে, “এআই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উন্মুক্ত সহযোগিতা, স্বচ্ছতা এবং সবার জন্য প্রযুক্তিগত প্রবেশাধিকার প্রয়োজন।”
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এআইয়ের সক্ষমতা দ্রুত বাড়তে থাকায় ভবিষ্যতে নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা আরও কঠোর করার দাবি জোরালো হতে পারে।
