যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সংঘাতে ওয়াশিংটন কৌশলগতভাবে ব্যর্থ হয়েছে বলে দাবি করেছে ইরান। একই সঙ্গে ক্যাস্পিয়ান সাগরে একটি ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনায় ইউক্রেনকে পাল্টা জবাব দেওয়ারও হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে সামরিক অভিযান, কূটনৈতিক উত্তেজনা ও সীমান্ত পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, ইসরায়েলের প্রভাবেই যুক্তরাষ্ট্র পাঁচ মাস আগে যে যুদ্ধ শুরু করেছিল, তা এখন ওয়াশিংটনের জন্য অচলাবস্থায় পরিণত হয়েছে। তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র “সংঘাত শেষ করতে হিমশিম খাচ্ছে” এবং এর মূল্য একসময় পরিশোধ করতে হবে।
প্রায় দুই সপ্তাহের তীব্র বিমান হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে নতুন হামলা থেকে বিরত রয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ইরানও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন এলাকায় পাল্টা হামলা সাময়িকভাবে স্থগিত রেখেছে।
তেহরানে এক সংবাদ সম্মেলনে ইসমাইল বাঘাই বলেন, ক্যাস্পিয়ান সাগরে একটি ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজে ইউক্রেনের হামলার ঘটনা কোনোভাবেই উপেক্ষা করা হবে না। তিনি জানান, জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌম অধিকার রক্ষার প্রশ্নে ইরান তার অবস্থান থেকে সরে আসবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ঘটনার জবাবে ইরান রাশিয়ার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সামরিক সহযোগিতায় যেতে পারে অথবা সরাসরি সামরিক প্রতিক্রিয়াও বিবেচনা করতে পারে। তবে তেহরান চায় না ক্যাস্পিয়ান সাগর নতুন কোনো সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হোক।
জর্ডানের সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, সোমবার সকালে দেশটির আকাশসীমায় প্রবেশ করা দুটি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। এ ঘটনায় কোনো হতাহত বা সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। ড্রোন দুটি কারা পাঠিয়েছিল, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষ কোনো তথ্য দেয়নি।
এর আগে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছিল, গত দুই সপ্তাহে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মাধ্যমে জর্ডানে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলোতে তারা বড় ধরনের আঘাত হেনেছে। একই সময়ে কুয়েত ও বাহরাইনে ইরানি হামলারও নিন্দা জানিয়েছিল মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ।
চলতি মাসের শুরুতে দুই ফরাসি কূটনীতিককে আটকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তেহরান ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে।
ইরানের দাবি, “নাগরিক সমাজের সঙ্গে যোগাযোগের” অজুহাতে ওই কূটনীতিকরা দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেছেন। ১৯ জুলাই তাদের কয়েক ঘণ্টা আটক রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে তারা দূতাবাসে ফিরে যাওয়ার অনুমতি পান। আটক হওয়া কূটনীতিকদের একজন শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগও করেছেন।
ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যাঁ-নোয়েল ব্যারো ঘটনাটিকে “অত্যন্ত গুরুতর ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা” হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্র সফরে ওয়াশিংটনের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমন্ত্রণে অনুষ্ঠিতব্য বৈঠকে দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
সফরের আগে নেতানিয়াহু জানান, নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানির গ্রেপ্তারের আহ্বান সত্ত্বেও তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা বজায় রেখেছেন।
গত সপ্তাহে মামদানি নেতানিয়াহুকে “যুদ্ধাপরাধী” আখ্যা দিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকরের আহ্বান জানান। তবে ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তার করা হবে না।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের নভেম্বরে গাজা উপত্যকায় কথিত যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে নেতানিয়াহু এবং সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত।
গাজা উপত্যকায় চলমান যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও খান ইউনিসের দক্ষিণে ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রের বাইরে ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে অন্তত দুই ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।
অন্যদিকে অধিকৃত পশ্চিম তীরে সামরিক অভিযান, গণগ্রেপ্তার এবং ঘরবাড়ি ভাঙার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। কালান্দিয়া শরণার্থী শিবিরে একটি কারিগরি কলেজে অভিযান চালিয়ে শিক্ষকসহ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে বলে ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফা জানিয়েছে।
সিলওয়ান এলাকায় একটি ফিলিস্তিনি বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া রামাল্লাহর পূর্বাঞ্চলের আল-মুঘাইয়ির এলাকায় ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা ফিলিস্তিনিদের কৃষিজমিতে গবাদিপশু চরিয়ে ফসল ও গাছপালার ক্ষতি করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সানা জানিয়েছে, কুনেইত্রা প্রদেশের পশ্চিম সামদানিয়া গ্রামে অভিযান চালিয়ে এক বেসামরিক ব্যক্তিকে আটক করেছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। একই সময়ে দারা প্রদেশের ইয়ারমুক অববাহিকার কয়েকটি গ্রামের দিকেও ইসরায়েলি বাহিনীর অগ্রসর হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
তবে এসব অভিযানের বিষয়ে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করা হয়নি।
