দেশে হামের সংক্রমণ উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে সারা দেশে এক হাজারের বেশি মানুষের শরীরে হাম বা এর উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৩০ দিনে হামের উপসর্গ নিয়ে ৭১০ জন এবং নিশ্চিত হামে ৯৫ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের অধিকাংশই শিশু।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বুধবার সকাল ৮টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টার মধ্যে সুনামগঞ্জ ও গাইবান্ধার দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ১৫ মার্চ থেকে হামে আক্রান্ত ও উপসর্গজনিত মৃত্যুর তথ্য প্রকাশ করছে। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, এ সময়ে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে, যেখানে মৃতের সংখ্যা ৩৬৬। এরপর রয়েছে সিলেট বিভাগে ১০৯ জন। এছাড়া রাজশাহী বিভাগে ৯২ জন, ময়মনসিংহে ৬৯ জন, চট্টগ্রামে ৬৬ জন, বরিশালে ৬২ জন, খুলনায় ৩১ জন এবং রংপুর বিভাগে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
এদিকে, হামের বিস্তার ঠেকাতে টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সংস্থাটির দাবি, চলতি বছরে আট বিভাগে লক্ষ্যমাত্রার ১০৩ শতাংশ শিশুকে হাম-রুবেলা টিকার আওতায় আনা হয়েছে। এ পর্যন্ত মোট ১ কোটি ৮৪ লাখ ৮২ হাজার ৩৫ ডোজ টিকা প্রয়োগ করা হয়েছে।
তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন মনে করেন, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুর টিকাদান নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি বলেন, “স্বাস্থ্য বিভাগ জরুরি ভিত্তিতে অনেক কাজ করেছে। কিন্তু ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকা দেওয়া ছাড়া হাম নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। তবে এ কাজ সরকারের পক্ষে করা সম্ভব; বিশেষ করে দ্বিতীয় ডোজের টিকার ক্ষেত্রে এ কাজ করতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, শহর ও গ্রামের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সব শিশু টিকার আওতায় এসেছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। তাঁর মতে, তৃণমূল পর্যায়ে টিকাদান নিশ্চিত করার পাশাপাশি জ্বরে আক্রান্ত শিশুদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে ডেঙ্গু পরীক্ষা করা উচিত। ডেঙ্গু শনাক্ত না হলে হামের সম্ভাবনা বিবেচনায় হাসপাতালে পর্যবেক্ষণে রাখা হলে মৃত্যুহার কমানো সম্ভব।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ১ হাজার ৪১ জনের শরীরে হাম অথবা এর উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১৬৬ জনের শরীরে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে। গত ১৩০ দিনে মোট ১ লাখ ৩৬ হাজার ২০৭ জনের মধ্যে হাম বা এর উপসর্গ পাওয়া গেছে। একই সময়ে চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১ লাখ ১৮৮ জন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত ছয় মাসে বাংলাদেশে হাম বা হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছেন ৪২ হাজার ১৭৪ জন। এই সময়ে বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় বাংলাদেশেই রোগীর সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, একসময় নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি ও জাতীয় ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে বাংলাদেশ সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত ছিল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টিকাদানে ঘাটতি তৈরি হওয়ায় হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগের প্রাদুর্ভাব আবারও বাড়ছে বলে তারা মনে করছেন।
