চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার পরিবহনে টানা চতুর্থ অর্থবছরের মতো শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি)। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫–২৬ অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি কনটেইনার হ্যান্ডলিং করেছে টার্মিনালটি। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি), তৃতীয় চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) এবং চতুর্থ অবস্থানে উঠে এসেছে সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠান রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল (আরএসজিটি) পরিচালিত আরএসজিটি চিটাগং।
টার্মিনাল অপারেটর ও বন্দর সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের পাঁচটি প্রধান কনটেইনার টার্মিনালের পরিবহন পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে এ চিত্র পাওয়া গেছে। তবে এই র্যাংকিং কেবল পরিবহন করা কনটেইনারের সংখ্যার ভিত্তিতে করা হয়েছে। টার্মিনালগুলোর জেটির সংখ্যা, ক্রেন, যন্ত্রপাতি ও পরিচালন সক্ষমতার পার্থক্যের কারণে কর্মদক্ষতার তুলনা এতে অন্তর্ভুক্ত নয়।
২০২৫–২৬ অর্থবছরের শুরুতে এনসিটির পরিচালনার দায়িত্ব নেয় বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান চিটাগং ড্রাই ডক লিমিটেড। এর আগে টার্মিনালটি পরিচালনা করেছিল সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড। বর্তমানে এটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে।
দেশের সবচেয়ে পুরোনো কনটেইনার সুবিধা জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি)। ২০১৬–১৭ অর্থবছর পর্যন্ত কনটেইনার পরিবহনে শীর্ষে ছিল এই টার্মিনাল। তবে এনসিটির চারটি জেটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হওয়া এবং আধুনিক গ্যান্ট্রি ক্রেন সংযোজনের পর পরিস্থিতি বদলে যায়।
২০১৭–১৮ অর্থবছরে প্রথমবার জিসিবিকে ছাড়িয়ে শীর্ষে উঠে আসে এনসিটি। এরপর কয়েক বছর দুই টার্মিনালের মধ্যে অবস্থান পরিবর্তন হলেও ২০২২–২৩ অর্থবছর থেকে টানা চার বছর ধরে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে এনসিটি।
সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে এনসিটিতে ১৩ লাখ ৮৫ হাজার একক কনটেইনার পরিবহন হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৮ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে জিসিবিতে পরিবহন হয়েছে ১০ লাখ ৩৬ হাজার একক কনটেইনার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৮ দশমিক ২৪ শতাংশ কম।
জিসিবিতে কনটেইনার পরিবহন কমার কারণ সম্পর্কে বার্থ অপারেটরস, শিপহ্যান্ডলিং অপারেটরস অ্যান্ড টার্মিনাল অপারেটরস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বোটসোয়া) সভাপতি ফজলে একরাম চৌধুরী বলেন, সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে জিসিবিতে জাহাজ বরাদ্দ কম ছিল। তবে ছয়টি জেটির অপারেটরদের প্রয়োজনীয় সক্ষমতা রয়েছে এবং তারা জাহাজের নিজস্ব ক্রেন ব্যবহার করেও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর নির্মিত প্রথম পূর্ণাঙ্গ কনটেইনার টার্মিনাল সিসিটি। দুই জেটির এই টার্মিনালে ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ৪ লাখ ৩১ হাজার একক কনটেইনার পরিবহন হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২১ শতাংশ কম।
সাইফ পাওয়ারটেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তরফদার রুহুল আমিন জানান, সিসিটির গ্যান্ট্রি ক্রেনগুলো পুরোনো হয়ে যাওয়ায় মাঝেমধ্যে অচল থাকে, ফলে পরিবহন কার্যক্রমে প্রভাব পড়েছে। তিনি বলেন, এনসিটিতে প্রতিটি জেটিতে তিনটি করে গ্যান্ট্রি ক্রেন থাকায় সেখানে কনটেইনার পরিবহনের গতি অনেক বেশি।
সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় ২২ বছরের জন্য পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল (আরএসজিটি)। ২০২৪ সালের জুনে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করা এই টার্মিনাল বর্তমানে আরএসজিটি চিটাগং নামে পরিচালিত হচ্ছে।
২০২৪–২৫ অর্থবছরে টার্মিনালটিতে প্রায় ৭৫ হাজার একক কনটেইনার পরিবহন হলেও সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে তা বেড়ে ২ লাখ ৭৯ হাজারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ এক বছরে পরিবহন বেড়েছে প্রায় ২৬৮ শতাংশ। টার্মিনালটির বার্ষিক সক্ষমতা প্রায় ৫ লাখ একক কনটেইনার।
আরএসজিটি বাংলাদেশের হেড অব কমার্শিয়াল অ্যান্ড পাবলিক অ্যাফেয়ার্স সৈয়দ আরেফ সারোয়ার জানান, আগস্টের মাঝামাঝি নতুন গ্যান্ট্রি ক্রেন চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে চলতি অর্থবছরে ৫ লাখ একক কনটেইনার পরিবহনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
চট্টগ্রামের বাইরে সমুদ্রগামী জাহাজ থেকে কনটেইনার ওঠানো-নামানোর সুবিধা রয়েছে মোংলা বন্দরে। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে সেখানে ২৯ হাজার ৭৫১ একক কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩৮ শতাংশ বেশি। তবে দেশের মোট কনটেইনার পরিবহনে মোংলা বন্দরের অংশ এখনো প্রায় ১ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কনটেইনার টার্মিনালের সংখ্যা ও অপারেটর বাড়লেও ব্যবহারকারীদের জন্য পূর্ণাঙ্গ প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি। জাহাজ কোন টার্মিনালে ভিড়বে, তা নির্ধারণে বন্দর কর্তৃপক্ষের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় সেবা ও মাশুলে প্রতিযোগিতা সীমিত রয়েছে।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, টার্মিনালগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি হওয়া ইতিবাচক। তবে নির্দিষ্ট একক মাশুলের পরিবর্তে সর্বোচ্চ মাশুল নির্ধারণ করে দিলে অপারেটররা চাইলে কম খরচে উন্নত সেবা দিতে পারবে। এতে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং ব্যবহারকারীরাও এর সুফল পাবেন।
