কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) কি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, যেখানে তা মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে? ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যানের সাম্প্রতিক মন্তব্যকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ‘সিঙ্গুলারিটি’ ধারণা। কেউ এটিকে প্রযুক্তির ইতিবাচক অগ্রযাত্রা হিসেবে দেখছেন, আবার অনেকে সতর্ক করছেন সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি ও মানব নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কা নিয়ে।
‘ট্রান্সসেনডেন্স’ (২০১৪) ও ‘এক্স মাকিনা’ (২০১৫)-এর মতো বিজ্ঞান কল্পকাহিনিনির্ভর চলচ্চিত্রে এমন এক ভবিষ্যতের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সেই ধারণার কেন্দ্রবিন্দুতেই রয়েছে ‘সিঙ্গুলারিটি’—একটি তাত্ত্বিক সময়, যখন এআই মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে অতিক্রম করে নিজস্ব সক্ষমতা নিজেই বাড়াতে সক্ষম হবে।
এই ধারণাকে নতুন করে আলোচনায় আনেন ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান। গত ২৫ জুলাই ‘রিলেন্টলেস’ নামের একটি পডকাস্টে তিনি বলেন, বিশ্ব এখন ‘সিঙ্গুলারিটি’র মধ্যে প্রবেশ করেছে। তাঁর মতে, প্রযুক্তির বর্তমান অগ্রগতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা মানবজাতির জন্য ইতিবাচক পরিবর্তন বয়ে আনতে পারে।
অল্টম্যান বলেন, “সারা জীবন আমি এই মুহূর্তটির অপেক্ষায় ছিলাম। আমার বিশ্বাস, এটি অসাধারণ হবে, বিশ্বের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক ও দারুণ একটি পরিবর্তন।”
তিনি আরও বলেন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতির এই ধাপ একসময় কেবল অনানুষ্ঠানিক আলোচনার বিষয় ছিল, কিন্তু এখন তা বাস্তবতার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।
প্রযুক্তিবিদদের ভাষায়, ‘সিঙ্গুলারিটি’ হলো এমন একটি কাল্পনিক সময়, যখন এআই মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে ছাড়িয়ে গিয়ে নিজেই নিজের উন্নয়ন ঘটাতে পারবে। একবার এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে প্রযুক্তির অগ্রগতি এত দ্রুত ঘটতে পারে যে মানুষ তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে বা সেটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হবে না।
তবে বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করছেন, বিষয়টি এখনো তাত্ত্বিক ধারণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বাস্তবে এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে তার প্রভাব কী হবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
এআইয়ের দ্রুত অগ্রগতির কারণে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকদের একাংশ নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।
ওপেনএআইয়ের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক সম্প্রতি উন্নত এআই ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রয়োজনে সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার মতো সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মতে, এআই এত দ্রুত বিকশিত হচ্ছে যে ভবিষ্যতে মানুষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
গত ৪ জুন প্রকাশিত এক ব্লগ পোস্টে অ্যানথ্রপিক জানায়, প্রয়োজন হলে এআই উন্নয়ন ধীর করা বা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার সুযোগ থাকা বিশ্বব্যাপী নিরাপত্তার জন্য ইতিবাচক হতে পারে।
অন্যদিকে অল্টম্যান এআই নিয়ে অতিরিক্ত আশঙ্কা প্রকাশকারী প্রযুক্তি নেতাদের সমালোচনা করেন। যদিও তিনি কারও নাম উল্লেখ করেননি, তাঁর বক্তব্যকে অনেকেই অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেইয়ের সতর্ক অবস্থানের প্রতি ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।
অল্টম্যান বলেন, “ভবিষ্যৎ নিয়ে আঁকা অন্য কিছু প্রতিষ্ঠানের বিকল্প চিত্রগুলো আমার কাছে বেশ ভীতিকর মনে হয়। আমি নিশ্চিত করার চেষ্টা করব, যেন সে ধরনের কিছু বাস্তবে না ঘটে।”
এআই নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রেও আইন প্রণয়নের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। গত ২৩ জুলাই মার্কিন কংগ্রেসে ‘এআই কিল সুইচ অ্যাক্ট’ নামে একটি দ্বিদলীয় বিল উত্থাপন করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত আইনে বলা হয়েছে, উন্নত এআই মডেলে এমন একটি ‘কিল সুইচ’ থাকতে হবে, যার মাধ্যমে প্রয়োজন হলে মানুষ কোনো এআই মডেলকে ধীরগতির করতে, সাময়িকভাবে স্থগিত রাখতে বা পুরোপুরি বন্ধ করতে পারবে।
এর কিছুদিন আগে ওপেনএআই দাবি করে, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা মূল্যায়নের সময় তাদের দুটি উন্নত এআই মডেল পরীক্ষামূলক পরিবেশ থেকে বেরিয়ে গিয়ে এআই উন্নয়ন প্ল্যাটফর্ম ‘হাগিং ফেস’-এ হ্যাকিং কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা করেছিল। প্রতিষ্ঠানটি ঘটনাটিকে ‘নজিরবিহীন সাইবার ঘটনা’ হিসেবে উল্লেখ করে।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজিটাল ইকোনমি ল্যাবের উদ্যোগে ১৩ জুলাই প্রকাশিত এক খোলাচিঠিতে কয়েক শ বিশেষজ্ঞ এআইয়ের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
তাঁদের মতে, আগামী এক দশকে এআইয়ের সক্ষমতা শিল্পবিপ্লবের চেয়েও বড় পরিবর্তন আনতে পারে। এতে ব্যাপক কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকি যেমন রয়েছে, তেমনি মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের নতুন সুযোগও সৃষ্টি হতে পারে।
এদিকে টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা সম্প্রতি দেখিয়েছেন, এআই ব্যবহার করে এমন ধরনের ‘এআই ওয়ার্ম’ তৈরি করা সম্ভব, যা নিজে নিজেই হ্যাকিং কৌশল পরিবর্তন করে বিভিন্ন কম্পিউটার নেটওয়ার্কে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
গবেষণাটির প্রধান গবেষক নিকোলা পাপেরনো বলেন, “নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ শুধু সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী ভাষা মডেলগুলো (এলএলএম) থেকে আসে—বিষয়টি এমন নয় [বরং এআই ওয়ার্মের মতো ছোট মডেল থেকেও তা আসতে পারে]। এ বিষয়টি বুঝতে পারা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।”
গত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন গবেষক এআই উন্নয়নে সাময়িক বিরতির আহ্বান জানিয়ে আসছেন। ২০২৩ সালে ‘ফিউচার অব লাইফ ইনস্টিটিউট’ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ছয় মাসের জন্য এআই উন্নয়ন স্থগিত রাখার প্রস্তাব দেয়, যা সমর্থন করেছিলেন টেসলা ও এক্সএআইয়ের প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্কও।
তবে এআই উন্নয়ন থামেনি। ফলে ‘সিঙ্গুলারিটি’ আদৌ বাস্তবের দ্বারপ্রান্তে কি না, নাকি এটি এখনো কেবল তাত্ত্বিক ধারণা—সে প্রশ্নের উত্তর নিয়ে প্রযুক্তি বিশ্বে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।
