আগামী সেপ্টেম্বরে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের ‘আউটরিচ’ পর্বে অংশ নিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত। তবে এই আমন্ত্রণ গ্রহণ করে বাংলাদেশ সম্মেলনে অংশ নেবে কি না, সে বিষয়ে এখনো সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে আলোচনা শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্র, ফিলিপাইন ও মালদ্বীপ সফর শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মঙ্গলবার সকালে দেশে ফিরেছেন।
এর আগে ২৩ জুলাই পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, ভারতের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে পাঠানো আমন্ত্রণপত্র পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পৌঁছেছে এবং পরে তা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত ১৪ জুলাই ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের মাধ্যমে পাঠানো কূটনৈতিক বার্তায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলনের ‘আউটরিচ’ পর্বে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান।
ব্রিকস হলো উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর একটি জোট। বর্তমানে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও ইন্দোনেশিয়া এ জোটের সদস্য। অন্যদিকে, বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা হলো বিমসটেক।
ব্রিকসের ‘আউটরিচ’ পর্বে সাধারণত সদস্য নয় এমন নির্বাচিত দেশ ও আঞ্চলিক সংস্থার নেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। বাংলাদেশ ২০২৩ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে এই পর্বে আমন্ত্রণ পাচ্ছে। ২০২৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গ এবং ২০২৪ সালে রাশিয়ার কাজানে অনুষ্ঠিত আউটরিচ অধিবেশনে বাংলাদেশ অংশ নেয়। তবে ২০২৫ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে আয়োজিত সম্মেলনের আউটরিচ পর্বে বাংলাদেশ অংশ নেয়নি।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে আসছে। এ কারণে আউটরিচ পর্বে অংশগ্রহণ সদস্যপদের সম্ভাবনা জোরদার করার পাশাপাশি বহুপক্ষীয় কূটনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। চীন ও রাশিয়া ইতোমধ্যে বাংলাদেশের সদস্যপদের প্রতি সমর্থনের কথা জানিয়েছে।
দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, এবারের সম্মেলনে ব্রিকসভুক্ত অধিকাংশ দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। ফলে শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে চীন, রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের নেতাদের মতবিনিময়ের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, “কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য হতে আগ্রহী। সে বিবেচনায় আউটরিচ পর্বে প্রধানমন্ত্রীর অংশ নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে এটি নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে সম্ভাব্য প্রথম বৈঠকের সুযোগও তৈরি করতে পারে। বহুপক্ষীয় এই ফোরামের সুযোগ বাংলাদেশের কাজে লাগানো উচিত।”
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, “বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য নয়, পর্যবেক্ষক হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ফলে সরকারের পর্যায়ে সিদ্ধান্ত আসবে, প্রধানমন্ত্রী যাবেন কি না। গেলে অনেকের সঙ্গে বৈঠক হওয়ার সুযোগ থাকে। তবে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।”
কূটনৈতিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আমন্ত্রণপত্রে নরেন্দ্র মোদি উল্লেখ করেছেন, ব্রিকস প্রতিষ্ঠার ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ‘সহনশীলতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি নির্মাণ’। সম্মেলনে জনগণকেন্দ্রিক উন্নয়ন, ‘মানবতাই সবার আগে’ নীতির আলোকে সহযোগিতা জোরদার এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিভিন্ন সমসাময়িক ইস্যু নিয়ে আলোচনা হবে।
চিঠিতে মোদি আরও আশা প্রকাশ করেন, বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমানের উপস্থিতি ‘ব্রিকস আউটরিচ’ পর্বকে আরও সমৃদ্ধ করবে। একই সঙ্গে শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ ও মতবিনিময়ের আগ্রহও প্রকাশ করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে বাংলাদেশ বিমসটেকের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি। এমন পরিস্থিতিতে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য প্রথম বৈঠকের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের (বিইআই) সভাপতি এম হুমায়ুন কবীর বলেন, “ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক যে গতিতে এগোনোর প্রত্যাশা ছিল, বাস্তবে তা দেখা যায়নি। এমন প্রেক্ষাপটে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন দুই প্রতিবেশী দেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বৈঠকের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। ভারতও সেই সুযোগকে কাজে লাগাতে আগ্রহী।”
