আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণে ১১–দলীয় ঐক্যের শরিকদের মধ্যে মতভেদ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। জোটের অন্যতম প্রধান দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে, জোটভুক্ত কয়েকটি দল সংসদ নির্বাচনের মতো সমন্বিত নির্বাচনী কৌশল বজায় রাখার পক্ষে মত দিচ্ছে। সমঝোতা না হলে বিকল্প জোট গঠনের সম্ভাবনাও বিবেচনা করছে কিছু দল।
দলীয় সূত্রগুলো জানায়, নির্বাচন কমিশন আগামী অক্টোবর থেকে ধাপে ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরের নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় এটিই হবে দলগুলোর প্রথম বড় নির্বাচনী পরীক্ষা। তাই এখন থেকেই প্রার্থী নির্বাচন ও সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
জামায়াতের নেতাদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো আসনভিত্তিক নয়। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে সিটি করপোরেশন পর্যন্ত বিপুলসংখ্যক পদে কেন্দ্রীয়ভাবে সমঝোতা বাস্তবসম্মত নয়। বরং এ নির্বাচন স্থানীয় নেতৃত্ব গড়ে তোলা এবং সাংগঠনিক সক্ষমতা যাচাইয়ের সুযোগ।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ গত ২০ জুলাই বলেন, “জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনে সমঝোতা করতেই কয়েক মাস সময় লেগেছিল। স্থানীয় সরকারের বিপুলসংখ্যক পদে সে ধরনের সমঝোতা বাস্তবসম্মত নয়। অতীতে কখনো জোটবদ্ধভাবে নির্বাচনও হয়নি। তবে স্থানীয় পর্যায়ে কোথাও সমঝোতা হলে কেন্দ্র থেকে কোনো বাধা থাকবে না।”
জামায়াতকে বাদ দিয়ে বিকল্প সমঝোতার আলোচনা চলছে—এমন বিষয়ে তিনি বলেন, এ ধরনের কোনো আলোচনা সম্পর্কে তাঁর জানা নেই।
১১–দলীয় ঐক্যের একাধিক সূত্রের দাবি, স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও জোটগত সমন্বয় না থাকলে মাঠপর্যায়ে ভোট বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই ঐক্যবদ্ধভাবে প্রার্থী দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে কয়েকটি শরিক দল।
সবচেয়ে বেশি অসন্তোষ রয়েছে খেলাফত মজলিসের একটি অংশে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রত্যাশার তুলনায় কম আসন পাওয়া এবং সংরক্ষিত নারী আসন না মেলায় দলটির মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। গত ২৫ জুলাই দলটি ১১–দলীয় ঐক্যের কর্মসূচিতে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তও জানায়।
খেলাফত মজলিসের নেতারা জানিয়েছেন, জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। তবে তা সম্ভব না হলে তারা এককভাবে নির্বাচন কিংবা জামায়াত ছাড়া অন্য দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয় বিবেচনা করবে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, “আমরা সংসদ নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনও জোটবদ্ধভাবে করতে চাই। তবে জামায়াত এককভাবে গেলে আমাদের বিকল্প ভাবতে হবে। কী হবে সেই বিকল্প, তা আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
অন্যদিকে এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জুর মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কেন্দ্রীয়ভাবে ১১ দলের জোট হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন জেলা বা উপজেলায় সমঝোতা হতে পারে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি) সাংগঠনিক প্রস্তুতি নিচ্ছে। দলীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আপাতত এককভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিলেও ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ সিটি করপোরেশনগুলোতে সমঝোতার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না।
দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব ২১ জুলাই বলেন, “এনসিপি আপাতত এককভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে সাংগঠনিক অবস্থান শক্তিশালী করা এবং সম্ভাব্য প্রার্থীদের পরিচিত করার চেষ্টা করছে। তবে তফসিল ঘোষণার আগে বা পরে যদি মনে হয়, সমঝোতা করলে জয়ের সম্ভাবনা বাড়বে, তখন বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।”
এদিকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক জানিয়েছেন, এনসিপির সঙ্গে তাদের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত জোটবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি।
রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে এখনো কোনো দল চূড়ান্ত অবস্থান নেয়নি। তবে কেন্দ্রীয়ভাবে সমন্বিতভাবে নির্বাচন হবে, নাকি স্থানীয় বাস্তবতার ভিত্তিতে দলগুলো ভিন্ন কৌশলে এগোবে—সে প্রশ্নে ১১–দলীয় ঐক্যের শরিকদের অবস্থান ইতোমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণা করলে জোট রাজনীতির ভবিষ্যৎ কৌশল আরও পরিষ্কার হবে।
