জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদকে সামনে রেখে এআই গভর্নেন্স, অবকাঠামো ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় বিস্তৃত পরিকল্পনা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির বৈশ্বিক নীতিনির্ধারণে উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রতিনিধিত্ব শক্তিশালী করতে এবং প্রযুক্তি কূটনীতিতে নেতৃত্বের অবস্থান গড়ে তুলতে একটি উচ্চাভিলাষী রূপরেখা প্রণয়ন করেছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতিত্বকে সামনে রেখে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এআই গভর্নেন্স, জাতীয় অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ঘিরে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছে।
গত ২৭ জুলাই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড, ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজি (আইটিআইটি) উইং আয়োজিত ‘ন্যাশনাল এআই গভর্নেন্স অ্যান্ড ডিপ্লোমেসি ২০২৬’ শীর্ষক দ্বিতীয় জাতীয় ভার্চুয়াল টাউনহলে এই কৌশলগত রোডম্যাপ তুলে ধরা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন সংশ্লিষ্ট অণুবিভাগের মহাপরিচালক (ডিজি) ড. সৈয়দ মুনতাসির মামুন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইসিটি বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বমানের জাতীয় এআই ও কম্পিউটিং অবকাঠামো গড়ে তুলতে প্রাথমিকভাবে ৫০০ থেকে ৮০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ৬ হাজার থেকে ৯ হাজার কোটি টাকা) বিনিয়োগ প্রয়োজন। এর বড় অংশ ব্যয় হবে সুপারকম্পিউটিং জিপিইউ ক্লাস্টার নির্মাণে।
প্রযুক্তিবিদদের মতে, বাংলাদেশ যদি প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে নিজস্ব এআই প্রযুক্তি তৈরি করতে পারে, তবে সার্ভিস, এপিআই ও লাইসেন্সিং ফি থেকে বছরে ১৮ হাজার থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত আয় সম্ভব। প্রায় ২০ কোটি বাংলাভাষী মানুষের জন্য বাংলাদেশি ভাষাভিত্তিক এআই মডেলের উল্লেখযোগ্য আন্তর্জাতিক বাজার তৈরি হতে পারে বলেও তারা মনে করেন।
জাতীয় এআই অবকাঠামোর অর্থায়ন নিশ্চিত করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তিনটি কৌশল প্রস্তাব করেছে—
- ব্লেন্ডেড ফাইন্যান্সিং: উন্নয়ন সহায়তা (ওডিএ) ও বেসরকারি বিনিয়োগের সমন্বয়।
- এন্টারপ্রাইজ কানেক্ট: সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে যৌথ জিপিইউ কম্পিউটিং নেটওয়ার্ক।
- আইপি মনিটাইজেশন: বায়োইনফরমেটিক্স ও বৈজ্ঞানিক এআই উদ্ভাবনের পেটেন্ট বাণিজ্যিকীকরণ।
টাউনহলে ক্যানভা-এর প্রতিনিধিরা জানান, বাংলাদেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য ‘ক্যানভা এডুকেশন’-এর প্রিমিয়াম সুবিধা বিনামূল্যে দেওয়া হবে।
এদিকে, ব্রিটিশ কাউন্সিল বাংলাদেশ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার এবং শিক্ষকদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা উন্নয়নে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে।
ডি-রেডি ইউকে-এর প্রধান নির্বাহী অধ্যাপক আলমগীর হোসেন বলেন, কেবল আলোচনা নয়, বাস্তব ফলাফল নিশ্চিত করতে হবে। এ লক্ষ্যেই উদ্ভাবকদের জন্য ‘রাইজ-মি’ নামে একটি এআই টিউটরিং প্ল্যাটফর্ম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
টাউনহলে জানানো হয়, দেশে ‘বাংলাদেশ এআই অবজারভেটরি’ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর প্রধান দায়িত্ব হবে—
- জাতিসংঘের গ্লোবাল ডিজিটাল কমপ্যাক্ট-এর সঙ্গে জাতীয় অগ্রগতি মূল্যায়ন,
- সরকারি এআই অ্যালগরিদম পর্যবেক্ষণ ও ঝুঁকি বিশ্লেষণ,
- ফ্রিল্যান্সার ও গিগ-ওয়ার্কারদের কর্মনিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ,
- অ্যালগরিদমিক বৈষম্য নিয়ে গবেষণা পরিচালনা।
এ ছাড়া পাঁচটি থিমভিত্তিক ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের প্রস্তাবও উপস্থাপন করা হয়েছে, যা এআই গভর্নেন্স, মানবাধিকার, টেকসই উন্নয়ন, অবকাঠামো, গবেষণা ও অর্থায়ন নিয়ে কাজ করবে।
টাউনহলে প্রযুক্তির সামাজিক প্রভাব নিয়েও আলোচনা হয়। বাংলাদেশ উইমেন আইজিএফ-এর সভানেত্রী শামীমা আক্তার প্রযুক্তিনির্ভর যৌন সহিংসতা ও ডিপফেক প্রতিরোধে কঠোর আইন প্রণয়নের আহ্বান জানান।
অন্যদিকে বাংলাদেশ কিডস আইজিএফ-এর আয়েশা লাবিবা শিশুদের শুধু নীতির সুবিধাভোগী নয়, বরং নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ার সক্রিয় অংশীদার করার আহ্বান জানান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ এআইকে কূটনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে গ্লোবাল সাউথ-এর নেতৃত্ব জোরদার করতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তর, উন্নত কম্পিউটিং সক্ষমতা এবং এআই প্রশিক্ষণ তথ্য বিনিময়ের মতো সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া সার্ক ও বিমসটেক অঞ্চলের জন্য বাংলা ও স্থানীয় ভাষাভিত্তিক এআই প্রযুক্তির কেন্দ্র হিসেবে বাংলাদেশ গড়ে উঠতে পারে বলেও মত দেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারের জাতীয় এআই নীতি ২০২৬-২০৩০-এ সাতটি নতুন নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং বড় পরিসরের সুপারকম্পিউটিং অবকাঠামো গঠনের লক্ষ্য থাকলেও আগামী পাঁচ বছরের জন্য এআই ইনোভেশন ফান্ডে বরাদ্দ রাখা হয়েছে মাত্র ২০০ থেকে ২৫০ কোটি টাকা।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে এআই গবেষণা ও অবকাঠামোতে বার্ষিক ব্যয় ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি, চীনে ৭০ বিলিয়ন ডলারের বেশি, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডিজিটাল ইউরোপ কর্মসূচিতে ১০ থেকে ১২ বিলিয়ন ইউরো এবং ভারতের ইন্ডিয়া এআই মিশন-এ প্রাথমিকভাবে ১ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আইটি উইংয়ের মহাপরিচালক ড. সৈয়দ মুনতাসির মামুন বলেন,
“জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতিত্ব পাওয়া শুধু কূটনৈতিক সাফল্য নয়; উন্নয়নশীল বিশ্বের পক্ষে এআই নীতিনির্ধারণে নেতৃত্ব দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের মাধ্যমে এমন একটি জাতীয় অবস্থান গড়ে তুলতে চাই, যাতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের প্রতিটি নাগরিকের কণ্ঠস্বর প্রতিফলিত হয়।”
বাংলাদেশের পরিকল্পনায় ভারত, মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশকে সম্ভাব্য বাজার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ভাষাভিত্তিক এআই, প্রবাসী সেবা, জলবায়ু ও কৃষিভিত্তিক প্রযুক্তি উন্নয়নের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করার লক্ষ্যও এতে তুলে ধরা হয়েছে।
