মাদারীপুরের আধুনিক টিস্যু কালচার প্রযুক্তির মাধ্যমে কাচের বোতলে উৎপাদিত হচ্ছে রোগমুক্ত ফল, ফুল ও শোভাবর্ধক উদ্ভিদের চারা। এতে বিদেশি চারার ওপর নির্ভরতা কমছে, কৃষকের উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পাচ্ছে এবং দেশের বাণিজ্যিক কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হচ্ছে।
দেশে আধুনিক টিস্যু কালচার প্রযুক্তি ব্যবহার করে এখন কলা, আনারস, স্ট্রবেরি, ড্রাগন ফল, অর্কিড, লিলিয়াম, জারবেরা, স্টেভিয়া ও পেঁপেসহ বিভিন্ন উচ্চমূল্যের ফল, ফুল ও শোভাবর্ধক উদ্ভিদের রোগমুক্ত চারা উৎপাদন করা হচ্ছে। গবেষণাগারের জীবাণুমুক্ত পরিবেশে ক্ষুদ্র উদ্ভিদ টিস্যু থেকে কয়েক ধাপে হাজার হাজার চারা তৈরি করে তা কৃষক ও উদ্যোক্তাদের কাছে সরবরাহ করা হচ্ছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রযুক্তি দেশের আধুনিক ও বাণিজ্যিক কৃষির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। রোগমুক্ত ও উন্নতমানের চারা সহজলভ্য হওয়ায় উৎপাদনশীলতা বাড়ছে এবং কৃষকের লাভজনক চাষাবাদের সুযোগও বিস্তৃত হচ্ছে।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু নোমান ফারুক আহমেদ বলেন,
“সারা বিশ্বেই বাণিজ্যিক কৃষিতে টিস্যু কালচার প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার হচ্ছে। বাংলাদেশও সেই পথে এগোচ্ছে। আধুনিক কৃষির বিকাশ এবং রোগমুক্ত চারা তৈরি ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে এ প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়াতে হবে। কারণ, অল্প জায়গায় লাখ লাখ রোগমুক্ত চারা উৎপাদনে এর বিকল্প নেই।”
একসময় ভারত, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হতো এমন জি-৯ কলা, এমডি-২ আনারস, স্ট্রবেরি, ড্রাগন ফল, জারবেরা, লিলিয়াম, অর্কিড, স্টেভিয়া ও পেঁপের চারা এখন দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে।
২০২৫–২৬ অর্থবছরে মাদারীপুর হর্টিকালচার সেন্টার দুই লাখ তিন হাজারের বেশি চারা বিক্রি করেছে। এতে সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছে ৫২ লাখ ৩৩ হাজার টাকা।
সেন্টারের প্রধান আশুতোষ কুমার বিশ্বাস বলেন,
“শুধু ফলের চারা বিক্রি করলে আয় সীমিত থাকে। তাই আমরা ফুল ও শোভাবর্ধক গাছের চারার উৎপাদনও বাড়িয়েছি। এখানকার লিলিয়াম চারা এখন পঞ্চগড় পর্যন্ত যাচ্ছে।”
মাদারীপুরের টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরিতে কৃষিবিজ্ঞানীরা জীবাণুমুক্ত পরিবেশে বিশেষ পুষ্টিমাধ্যম ব্যবহার করে মাতৃগাছ থেকে সংগৃহীত টিস্যুর মাধ্যমে চারা উৎপাদন করছেন।
ল্যাবের দায়িত্বে থাকা কৃষিবিদ মো. এনামুল ইসলাম জানান, নির্বাচিত মাতৃগাছের টিস্যু বিশেষ প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণ করা হয়। এরপর কোষ বিভাজনের মাধ্যমে একটি টিস্যু থেকেই হাজার হাজার রোগমুক্ত চারা তৈরি সম্ভব হয়।
মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার কৃষক আবদুল কাদের দেড় বিঘা জমিতে জি-৯ জাতের কলার চাষ করেছেন। তাঁর বাগানের প্রতিটি ছড়িতে ২৫০ থেকে ৩০০টি কলা ধরেছে, যেখানে দেশি জাতের কলায় সাধারণত ১৩০ থেকে ১৬০টি কলা পাওয়া যায়।
তিনি বলেন, জি-৯ জাতের প্রতিটি চারার দাম ৩০ থেকে ৪০ টাকা। উন্নত ফলনের কারণে আশপাশের অনেক কৃষকও এখন এই জাতের কলা চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
অন্যদিকে, বগুড়ার শাজাহানপুরে ‘গ্রিন ওয়ান’ প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা মো. রেজওয়ানুল ইসলাম প্রায় ১ হাজার ৫০০টি জারবেরা গাছ লাগিয়েছেন। এতে তাঁর ব্যয় হয়েছে ৪২ হাজার টাকা। বর্তমানে প্রতি সপ্তাহে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকার ফুল বিক্রি হচ্ছে।
তিনি জানান, আগে ভারত থেকে একটি চারা আনতে প্রায় ৬০ টাকা খরচ হতো, এখন দেশীয় চারা পাওয়া যাচ্ছে ৩৫ টাকায়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ‘টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন প্রকল্প’-এর আওতায় বর্তমানে মাদারীপুর, বগুড়া ও ময়মনসিংহে তিনটি আধুনিক টিস্যু কালচার ল্যাব চালু রয়েছে। এছাড়া আরও আটটি জেলায় নতুন ল্যাব নির্মাণের কাজ চলছে।
প্রতিটি ল্যাব বছরে ১০ থেকে ১২ লাখ চারা উৎপাদনে সক্ষম। সবগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে বছরে প্রায় এক কোটি রোগমুক্ত চারা উৎপাদন সম্ভব হবে।
গত এক বছরে তিনটি ল্যাবে ২ লাখ ১২ হাজার চারা উৎপাদিত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৯৩ হাজার চারা কৃষক ও উদ্যোক্তাদের কাছে সরবরাহ করা হয়েছে। বর্তমানে সবচেয়ে বেশি চাহিদা রয়েছে জি-৯ কলা, জারবেরা ও স্ট্রবেরির চারার।
প্রকল্প পরিচালক তালহা জুবাইর মাসরুর বলেন,
“মাতৃগাছের বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রেখে রোগমুক্ত চারা উৎপাদনই এ প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা। এতে বিদেশি চারার ওপর নির্ভরতা কমছে, কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ও কমছে।”
তিনি আরও জানান, নতুন জাতের চারা উদ্ভাবনে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ গবেষণা কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৭৬টি হর্টিকালচার সেন্টার রয়েছে। চারা বিক্রিতে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে মাদারীপুর। দ্বিতীয় স্থানে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, তৃতীয় পাবনা, চতুর্থ দিনাজপুর এবং পঞ্চম স্থানে রয়েছে বরিশাল। ঢাকা অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি চারা বিক্রি হয় গাজীপুর হর্টিকালচার সেন্টার থেকে।
২০২৫–২৬ অর্থবছরে দেশের হর্টিকালচার সেন্টারগুলো থেকে চারা বিক্রি করে সরকারের আয় হয়েছে ৭ কোটি ৩৭ লাখ টাকা, যা আগের অর্থবছরের ৭ কোটি টাকা থেকে বেশি।
