২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান ঘিরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ছয়টি মামলার রায় ঘোষণা করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এসব রায়ে মোট ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ১১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অন্যান্য অভিযুক্তকে বিভিন্ন মেয়াদের সাজা দেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলাম বলেছেন, গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়েছিল। তার ভাষ্য, এখন পর্যন্ত দুটি ট্রাইব্যুনালের দেওয়া ছয়টি রায়ের মাধ্যমে সেই অঙ্গীকারের বড় অংশ বাস্তবায়িত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, সংবেদনশীল এসব মামলার বিচার দেশের অন্যান্য আদালতের তুলনায় তুলনামূলক কম সময়ে সম্পন্ন হয়েছে এবং বর্তমানে আরও বেশ কয়েকটি মামলার বিচার গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে।
প্রথম রায়ে ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেন। একই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী হওয়া সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পাশাপাশি শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের সম্পদ বাজেয়াপ্ত এবং শহীদ পরিবারের পাশাপাশি আহতদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
দ্বিতীয় রায়ে রাজধানীর চানখাঁরপুলে ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। একই মামলায় আরও কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এ ঘটনায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে ছয়জন নিহত হন।
তৃতীয় রায়ে আশুলিয়ায় ছয়টি মরদেহ পুড়িয়ে ফেলা এবং আরও একজনকে হত্যার ঘটনায় সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ সাইফুল ইসলামসহ ছয়জনের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করা হয়। একই মামলায় সাতজনকে যাবজ্জীবন এবং আরও কয়েকজনকে বিভিন্ন মেয়াদের সাজা দেওয়া হয়। রাজসাক্ষী শেখ আবজালুল হককে ক্ষমা করা হয়।
চতুর্থ রায়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলায় দুইজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এছাড়া মামলার অপর ২৫ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং ছাত্রলীগের কয়েকজন সাবেক নেতাও রয়েছেন।
পঞ্চম রায়ে রাজধানীর রামপুরায় একটি নির্মাণাধীন ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা এক তরুণকে গুলি করে হত্যা এবং একই এলাকায় আরও দুইজনকে হত্যার ঘটনায় সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। একই মামলায় একজনকে যাবজ্জীবন এবং গ্রেপ্তার হওয়া একমাত্র আসামি সাবেক এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
ষষ্ঠ রায়ে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একই সঙ্গে মামলার দুটি অভিযোগে এক লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশও দেন ট্রাইব্যুনাল। অভিযোগে বলা হয়, গণঅভ্যুত্থান দমনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার কথোপকথন এবং কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় তার বিরুদ্ধে কমান্ড রেসপন্সিবিলিটির অভিযোগ আনা হয়েছিল।
ট্রাইব্যুনালের নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৬ মে চানখাঁরপুলে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গ্রহণের মধ্য দিয়ে জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট অপরাধের বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমানে আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে সংঘটিত গুম, হত্যা এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট আরও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার দুটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলমান রয়েছে।
